প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ঘটে যাওয়া এক ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় সমাজে তুমুল আলোচনা চলছে। দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে বিয়ে করে উধাও হয়েছেন এক বয়স্ক শিক্ষক—এমন অভিযোগ শুধু পরিবারের ভাঙনই নয়, নৈতিকতা, সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ঘটনায় বিস্মিত স্থানীয় মানুষজন, আর মানসিক যন্ত্রণায় দিশেহারা শিক্ষকের প্রথম স্ত্রী শামীমা জাহান আশ্রয় নিয়েছেন থানার। তার অভিযোগ জানাতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেলেন; এমন চোখের জল যেন এই ঘটনার মানবিক বেদনা আরও বাড়িয়ে দেয়।
ঘটনা সূত্রে জানা যায়, তাড়াশ পৌর এলাকার শোলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা, রঘুনিলি মঙ্গলবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক মো. মনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরেই সংসার জীবন নিয়ে নানা সমস্যায় ছিলেন। কিন্তু সেই সমস্যার গভীরে কেউ তেমনভাবে তাকায়নি। তার স্ত্রী শামীমা জাহান নিজে একজন স্কুলশিক্ষক। পরিবারের দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের ইতোমধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে। বাইরে থেকে দেখলে সংসারটি স্বাভাবিকই মনে হতো, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে ছিল ভাঙনের সূচনা। আর সেই ভাঙনের ফলাফল এখন তাড়াশবাসীর মুখে মুখে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে একই উপজেলার খুটিগাছা গ্রামের আব্দুস সালামের মেয়ে সাদিয়া খাতুনের প্রেমের সম্পর্ক চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। বিষয়টি প্রথম স্ত্রীর কাছে নতুন ছিল না। তিনি বলেন, এর আগেও মনোয়ারের বিরুদ্ধে স্কুলের আরেক ছাত্রীকে নিয়ে প্রেমের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, যা যথেষ্ট আলোড়ন তোলে। সেবার মান-সম্মানের কথা ভেবে স্ত্রী তাকে ক্ষমা করেছিলেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। কারণ এবার মনোয়ার হঠাৎ করেই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যান।
কয়েক দিন ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান শামীমা জাহান। তিনি আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন, সহকর্মী—যার-তার কাছে খোঁজ করেন, কিন্তু কোনো তথ্য পান না। অবশেষে গোপনে খবর পান যে তার স্বামীকে নাকি দেখা গেছে খুটিগাছা তালপুকুরপাড় এলাকায়, যেখানকার এক বাড়িতে সাদিয়া থাকে। তথ্যটি পেয়ে মঙ্গলবার তিনি সেখানে যান এবং বাড়িতে ঢুকে এমন দৃশ্য দেখেন, যা কোনো স্ত্রীর জন্যই সহ্য করা কঠিন। স্বামী মনোয়ার ও সাদিয়াকে একই বিছানায় দেখে তিনি ভেঙে পড়েন।
তিনি সেখানে গিয়ে জানতে চান—কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, তার স্বামী কেন উধাও হয়ে ছিলেন, আর কেন একটি স্কুলছাত্রীর সঙ্গে এভাবে সম্পর্ক গড়েছেন? কিন্তু উত্তরে কোনো যুক্তি বা ব্যাখ্যা পাওয়া তো দূরের কথা, বরং তিনি অপমানের শিকার হন। অভিযোগ অনুযায়ী, মনোয়ার হোসেন নিজে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং সাদিয়ার স্বজনরাও তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে তেড়ে আসেন। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়, যা শামীমাকে আরও আতঙ্কিত করে তোলে।
স্ত্রীর প্রতি এমন আচরণ শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, আইনের চোখেও গভীর প্রশ্ন তৈরি করে। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এমন আচরণ সামাজিক ভাবে অগ্রহণযোগ্য। শিক্ষকতা পেশা এমন একটি অবস্থান, যেখানে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি প্রত্যাশিত। শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্ক কখনোই ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গায় যেতে পারে না; এটি শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মানসিকভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে।
পরবর্তীতে শামীমা জাহান নিরুপায় হয়ে বুধবার সন্ধ্যায় তাড়াশ থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমার স্বামী চরিত্রহীন। এর আগেও স্কুলের ছাত্রীর সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক হয়েছিল। তখন অনেক চেষ্টা করেছি তাকে বদলানোর। কিন্তু এবার যা করেছে, তা আর মেনে নেওয়ার মতো নয়। আমি সুষ্ঠু তদন্ত চাই এবং আমার মান-সম্মানের সঠিক প্রতিকার চাই।’’
মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেন। যদিও তার অস্বীকার সামাজিকমাধ্যমের আলোচনায় তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ ইতোমধ্যেই এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গেছে যে তিনি দশম শ্রেণির ছাত্রীকে বিয়ে করেছেন এবং সেই বিয়েকে কেন্দ্র করেই তিনি বাড়ি থেকে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, একজন শিক্ষকের এমন আচরণ অগ্রহণযোগ্য এবং এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ খারাপ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এদিকে তাড়াশ থানার ওসি জিয়াউর রহমান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন, কারণ দিনভর বাইরে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
ঘটনার আরও একটি দিক রয়েছে—এটি কেবল একটি পরিবারের সংকট নয়, বরং সমাজের নৈতিক সীমানা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব কী, স্কুলপরিবেশে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে, এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো অপরাধ কতখানি সচেতনভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নে ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শোলাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে এ ঘটনার প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষক মনোয়ারকে দ্রুত তদন্তের সম্মুখীন করানো উচিত এবং যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তিনি শুধু আইনগত নয়, পেশাগতভাবেও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবেন। কারণ তার আচরণে একজন শিক্ষকের পরিচয়ের মধ্যে থাকা নৈতিকতার সীমা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।
সামাজিকমাধ্যমেও এ ঘটনার ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, ‘‘এ ধরনের শিক্ষক যদি স্কুলে থাকে, তাহলে সন্তানরা কোথায় নিরাপদ?’’ আবার কেউ কেউ ছাত্রীর পরিবারের দিক থেকেও প্রশ্ন তুলছেন—একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীর সামনে কেন এমন সম্পর্ক তৈরি হতে দেওয়া হল? অভিভাবকের দায়িত্ব কি ছিল না মেয়েকে সঠিক পথে রাখার? দুই পক্ষের বিতর্কে ঘটনাটি এখন আলোচনার তুঙ্গে।
এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো—এ ঘটনা সমাজে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে শিক্ষকতার নৈতিকতা, দাম্পত্য জীবন, অপ্রাপ্তবয়স্কের সুরক্ষা—সবকিছু নিয়েই। আর শামীমা জাহানের চোখের জল যেন মনে করিয়ে দেয়, এমন ঘটনার মানবিক মূল্য কতটা গভীর।