ভর্তির শর্ত মানেনি ৫০ কলেজ, স্বীকৃতি স্থগিত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
ভর্তির শর্ত মানেনি ৫০ কলেজ, স্বীকৃতি স্থগিত

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ৫০টি কলেজের একাডেমিক স্বীকৃতি স্থগিতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত শিক্ষা অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই অনেক কলেজে শিক্ষার্থী সংকট, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এবং স্থানীয়ভাবে শিক্ষার্থী টানতে ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এবার বোর্ড সরাসরি শিক্ষার্থী ভর্তির শর্ত পূরণ না হওয়াকে কেন্দ্র করে একযোগে এতগুলো কলেজের স্বীকৃতি স্থগিত করার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা পরিস্থিতির গুরুত্ব ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সংকেতই বহন করে।

বোর্ড সূত্রে জানা যায়, যশোর শিক্ষা বোর্ডের ৫৮৬ কলেজে একাদশ শ্রেণির জন্য মোট আসন ছিল ২ লাখ ২১ হাজার ৯৪টি। কিন্তু ভর্তি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার ১৪৪ জন শিক্ষার্থী। ভর্তির ক্ষেত্রে বোর্ড কঠোরভাবে যে শর্ত আরোপ করেছিল—প্রতিটি কলেজে ন্যূনতম ১০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে হবে—তা অনেক কলেজই পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে যেসব ৫০টি কলেজে মাত্র ২ থেকে ৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি নবায়নের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের সময়ই তাদের ব্যর্থতা সামনে আসে। এই কারণেই বোর্ড তাদের একাডেমিক স্বীকৃতি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়।

শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর এসএম তৌহিদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বোর্ড সবসময়ই চাইছে কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে কাঙ্ক্ষিত মান ও পরিবেশ বজায় রাখুক। ভর্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কলেজের গ্রহণযোগ্যতা পরিমাপ করা হয়। যে কলেজে শিক্ষার্থীরা যেতে আগ্রহী নয়, সেই কলেজের কার্যক্রম কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে তা স্বভাবতই প্রশ্নবিদ্ধ। তাই এসব কলেজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, এ বছর ৫০টি কলেজকে শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বীকৃতি স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালের ভর্তি কার্যক্রম শেষ হলে একই প্রক্রিয়া আবার নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হবে, এবং যেসব কলেজ শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম জানান, স্থগিত হওয়া কলেজগুলোর কর্তৃপক্ষ অনলাইনে স্বীকৃতি নবায়নের আবেদন জমা দিয়েছিল। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, তারা ন্যূনতম ভর্তির শর্ত পালনে ব্যর্থ হয়েছে। শর্ত ভঙ্গের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই স্বীকৃতি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। তিনি বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ বারবার বোর্ডের শর্ত মেনে ভর্তি প্রচারণা চালানোর সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে প্রকৃত অগ্রগতি না হওয়ায় বোর্ডকে বাধ্য হয়েই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

যেসব কলেজের স্বীকৃতি স্থগিত করা হয়েছে, সেগুলোর নাম প্রকাশ না করার কারণ সম্পর্কেও বোর্ড দায়িত্বশীল অবস্থান নিয়েছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষকদের মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সুনাম কিছুটা হলেও রক্ষা করা প্রয়োজন। তাই নাম প্রকাশ না করে বিষয়টি গোপনীয়ভাবে ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম মনে করেছে বোর্ড। তবে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই কলেজগুলোর একাডেমিক কার্যক্রম বাতিল হওয়ার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব স্পষ্ট। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী মনে করছেন, শিক্ষার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে বোর্ডের এই উদ্যোগ ইতিবাচক। তারা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে অবকাঠামোগত ঘাটতি, শিক্ষক সংকট, পাঠদান ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কলেজ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল শুধুমাত্র নামসর্বস্বভাবে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবে মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। বোর্ডের এই কঠোর পদক্ষেপ শিক্ষার গুণগত মান রক্ষায় নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।

অবশ্য কলেজগুলোর একাংশ দাবি করছে, স্থানীয় জনসংখ্যা কম, অনেক এলাকায় ছাত্রছাত্রী সংখ্যা আগের তুলনায় কমে গেছে, পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উন্নত কলেজগুলোতে ভর্তির আগ্রহ বেশি থাকায় ছোট বা প্রান্তিক কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, কলেজ বাঁচাতে সরকারি সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ জরুরি। তারা অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থী সংকট কাটাতে কলেজগুলোকে পর্যাপ্ত সময় কিংবা বিকল্প সুযোগ দেওয়া হয়নি।

তবে শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, শিক্ষার মানের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। কোনো কলেজ যদি নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে তাকে শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, উপযুক্ত শিক্ষক, সুশৃঙ্খল প্রশাসন এবং আধুনিক শিক্ষাবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করতেই হবে। শুধু নাম ব্যবহার করে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ আর রাখা হবে না।

এই সিদ্ধান্তে যশোর অঞ্চলের শিক্ষা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সামনের দিনে কোন কোন কলেজ নিজেদের মানোন্নয়ন করে ভর্তির শর্ত পূরণ করতে পারে অথবা কোনগুলো চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়—তা সময়ই বলে দেবে। তবে শিক্ষা বোর্ডের এই উদ্যোগ যে শিক্ষার মান উন্নয়ন ও ন্যূনতম মানদণ্ড নিশ্চিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতভিন্নতা নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত