৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীর বহু ভবনে ফাটল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৫ বার

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঢাকাসহ সারা দেশে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর অনেকটা আতঙ্কের মধ্যে দিন শুরু করেছে নগরবাসী। অস্বাভাবিকভাবে তীব্র নড়াচড়া অনুভূত হওয়ার মুহূর্তেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবনের বাসিন্দারা নিচে নেমে আসতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ভিডিও, ছবি ও তথ্য—যেগুলোর বেশিরভাগই রাজধানীর বিভিন্ন ভবনে ফাটল ধরা দেয়ালের ছবি। এসব ছবি ও ভিডিওতে আতঙ্কের বাস্তবচিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভূমিকম্পটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে রাজধানীজুড়ে প্রায় একই সময়ে কম্পন অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর পরে নিশ্চিত করে জানায়, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকা। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। প্রাথমিকভাবে গুগল আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম জানিয়েছে, উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর ঘোড়াশাল থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে। ভূগর্ভের অগভীর স্তরে সৃষ্ট হওয়ায় কম্পনটি রাজধানীতে জোরালোভাবে অনুভূত হয়।

ঢাকার রামপুরার ওলন রোড এলাকায় একটি ভবনের পিলারে স্পষ্ট ফাটলের ছবি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যায়, ভবনের খুঁটির একটি অংশে সরু রেখা নয়, বরং গভীর ফাটলও দেখা যাচ্ছে, যা দেখে ব্যবহারকারীরা দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন। এরপর বাড্ডা লিংক রোড, দক্ষিণ বাড্ডা, মোহাম্মদপুরের শেখেরটেকসহ আরও এলাকায় একই ধরনের ঘটনা জানান ব্যবহারকারীরা। কিছু ভবনের বাসিন্দারা জানান, ভূমিকম্পের সময় তারা ভবনকে অস্বাভাবিকভাবে দুলতে দেখেছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব কমই দেখা গেছে।

মহাখালী, বারিধারা এবং গুলশান-২ এলাকার বেশ কয়েকটি ভবনে দেয়াল ও সিলিং ভেঙে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। বিশেষ করে পুরান ঢাকার বেশ কিছু পুরোনো ভবন থেকে খসে পড়া প্লাস্টার, ভেঙে পড়া চাঙড় আর দেওয়াল ফেটে যাওয়ার দৃশ্য নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভূমিকম্পের পর এলাকাগুলোতে আতঙ্কিত বাসিন্দারা দ্রুত ভবন থেকে নেমে রাস্তায় অবস্থান নেন। অনেককে শিশু-বৃদ্ধদের নিয়ে বাইরে বসে থাকতে দেখা গেছে।

এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা জানান, ভূমিকম্পটি দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলে অবস্থানকারী একটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের কারণে সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের মাত্রা ৫ দশমিক ৭ হলেও যেহেতু উৎপত্তিস্থল ছিল অগভীর, তাই কম্পন ঢাকায় বেশি মাত্রায় অনুভূত হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ ধরণের কম্পন ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করে। অনেক ভবনের নির্মাণ মান নিম্নমুখী হওয়ায় অল্পমাত্রার ভূমিকম্পেও ফাটল দেখা দিতে পারে।

ভূমিকম্পের পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মাঠে নামে। তারা একাধিক ভবনে সরেজমিন পরিদর্শন করে জানান, অধিকাংশ ফাটল পৃষ্ঠতলের; তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে কাঠামোগত ঝুঁকির সম্ভাবনা উড়িয়ে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া উচ্চতলা ভবনের লিফট ব্যবহার না করতেও বলা হয়েছে।

তবে সাধারণ মানুষ শুধু ফাটল নিয়ে নয়, ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্প নিয়েও উদ্বিগ্ন। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার একটি সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চলে, যেখানে ভারতীয় ও বার্মা প্লেটের সংঘর্ষের কারণে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার চারপাশে একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইন থাকায় মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্পও রাজধানীতে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

রাজধানীর কিছু বাসিন্দা জানিয়েছেন, ভূমিকম্প অনুভূত হতেই ভবন দুলে ওঠে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষ আতঙ্কে ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তেই ফাটল ধরা ভবনের ছবি ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্ক আরও বাড়ে। অনেকেই অভিযোগ করেন, ভবন নির্মাণের সময় ঠিকাদাররা মান বজায় না রাখায় এই ধরনের ক্ষতি ঘটে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভবন নির্মাণের তদারকি আরও কঠোর করার দাবি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একজন অধ্যাপক বলেন, “ভূমিকম্পটি খুব বেশি সময় স্থায়ী না হলেও এর ঝাঁকুনি ছিল তীব্র। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, রাজধানীর ভবনগুলো কাঠামোগতভাবে কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের ভবনগুলো ভূমিকম্প-সহনশীল করতে এখনই নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।”

সরকারের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা বাড়াতে শিগগিরই নতুন করে নির্দেশনা জারি করা হবে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হালনাগাদ করার কাজও শুরু হবে।

ভূমিকম্পের এই অভিজ্ঞতা আবারও প্রমাণ করল, ঢাকার ভবনগুলো এখনো ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুত নয়। এমন ঘটনার পর ভবনের কাঠামো পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা ছাড়া বিকল্প নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। রাজধানীর জনগণও এখন দাবি তুলেছেন—নিরাপদ ভবনের নিশ্চয়তা তাদের মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত