প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে গ্রামীণ ব্যাংকের পান্টি শাখায় ভোরে ঘটে যাওয়া কুমারখালী গ্রামীণ ব্যাংক আগুন চেষ্টার ঘটনার পর এলাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। চৌরঙ্গী বাজারের নীরব ভোর হঠাৎই আতঙ্কে ভরে ওঠে, যখন ব্যাংকের জানালার ফাঁক দিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। নৈশপ্রহরী দ্রুত বিষয়টি টের পাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি থেকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায় ব্যাংকটি। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে।
ভোরের শুরুতে ঘটনাস্থলের চারপাশে বাজারের নিয়মিত নীরবতা ছিল। ফজরের আজান চলছিল। ঠিক তখনই ব্যাংক ভবনের ভিতর থেকে আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে আসে। নৈশপ্রহরী ইসমাইল শেখ জানান, তিনি ভেতরে বসে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন। যদিও প্রতিটি ভোর তার কাছে একই রকম মনে হতো, সেই ভোরটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জানালার দিকে তাকাতেই তিনি আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পান। তাঁর চিৎকারে আশেপাশে থাকা মানুষ দৌড়ে এগিয়ে আসে। দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ব্যাংকটির ভেতরে আর আগুন ছড়িয়ে পড়েনি।
তিনি বলেন, ফজরের আজান চলছিল। আচমকা আলো আর উত্তাপ টের পেয়ে তিনি চিৎকার শুরু করেন। তখনই দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে দেখা যায়, বাইরে থেকে জানালার একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে কলাগাছের পাতা ভেতরে ঢুকিয়ে পেট্রল ঢালা হয়েছিল। এমন কৌশল ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে পরিকল্পিত। তবে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই তা নেভানো সম্ভব হওয়ায় বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. শাহজালাল সকালেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি জানান, নৈশপ্রহরীর উপস্থিতি এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো গেছে। তিনি আরও বলেন, জানালার সুরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। যদিও দুর্বৃত্তরা ভেতরে আগুন ধরানোর চেষ্টা করেছে, তারা বড় কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। ব্যাংকের কোন নথি বা যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংকের আশপাশে তখন মানুষের ভিড় জমে যায়। যদিও আগুন নিভে গেছে, তবুও ব্যাংকের দেয়াল থেকে ধোঁয়ার হালকা গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন, যেভাবে আগুন লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে উদ্দেশ্য ছিল ভয় সৃষ্টির পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ঘটানো। আবার অনেকে মনে করেন, ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখার জন্যই হয়তো এমন চেষ্টা করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি জানান, কলাপাতা ব্যবহার করে ভেতরে আগুন ধরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে পেট্রল ঢোকানো হয়েছিল। নৈশপ্রহরী বিষয়টি বুঝে ফেলার কারণে তাৎক্ষণিক আগুন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে পেট্রলের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে।
পুলিশের প্রথমিক ধারণা, দুর্বৃত্তরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাতের শেষভাগে এসে ব্যাংকের জানালার ফাঁক খুঁজে বের করেছিল। কারণ জানালার গ্রিল ভাঙা বা বড় কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বরং দেখা গেছে, ছোট একটি ছিদ্র দিয়েই আগুন ঢুকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, তারা অত্যন্ত সতর্কভাবে কাজ করেছে। যদিও তাদের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট, পুলিশ বলছে প্রতিটি সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় মানুষজন জানান, চৌরঙ্গী বাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তেমন কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটেনি। তাই এ ঘটনা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। এলাকার একজন ব্যবসায়ী বলেন, ভোরে যখন আগুন দেখা যায়, তখন সবাই ভয় পেয়ে যায়। অনেকেই মনে করেছিলেন হয়তো ব্যাংক লুট করতে এসেছে কেউ। তবে পরে জানা যায়, শুধুই আগুন লাগানোর চেষ্টা ছিল। যদিও ক্ষতি হয়নি, কিন্তু ভয়টুকু থেকেই গেছে।
গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীরা বলেন, ব্যাংকটি এলাকার বহু মানুষের অর্থনৈতিক সহায়তার কেন্দ্র। এমন প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগানোর চেষ্টা করলে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব পড়ে। অনেকেই প্রতিদিন সকালেই ব্যাংকে এসে বিভিন্ন কাজে লেনদেন করেন। তাই তারা মনে করেন, নিরাপত্তা আরও জোরদার করা দরকার।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ব্যাংকের জানালায় অতিরিক্ত গ্রিল, সিসিটিভি ও অ্যালার্ম সিস্টেম যুক্ত করা হবে। নৈশপ্রহরীর নিরাপত্তাও বাড়ানো হবে। কারণ যদি তিনি সেদিন উপস্থিত না থাকতেন বা দেরি করে বুঝতেন, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কারা এবং কোন উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তা জানতে তদন্ত দল কাজ করছে। স্থানীয়রা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি সতর্ক থাকার নির্দেশ পেয়েছেন। পুলিশ বলছে, দ্রুত অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
ব্যাংকের গ্রাহকদের অনেকে সকালে এসে বন্ধ দরজা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারেন, ভোরে আগুন লাগানোর চেষ্টা হয়েছিল। এরপর স্বাভাবিকভাবে ব্যাংক খুললেও মানুষের ভেতর ভয় কাটতে কিছুটা সময় যায়। কর্মীরা ধীরে ধীরে তাদের আশ্বস্ত করেন যে কোনো ক্ষতি হয়নি এবং সব নথি সুরক্ষিত রয়েছে।
দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের আশপাশে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। তারপরও অনেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে থাকেন। তাদের মতে, এমন ঘটনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ঘটনাটি ছোট মনে হলেও, এটি বড় ধরনের নাশকতার ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
পুলিশ কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে পুরো ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আর গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শাখার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঝুঁকি আর না থাকে।