প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে রাজধানী ঢাকা কেঁপে ওঠে। আরমানিটোলা এলাকার একটি ছয় তলা ভবন হঠাৎ হেলে পড়ে। এই মুহূর্তে ভবনটির ভেতরে কেউ ছিলেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, কম্পনের মাত্রা এতটা শক্তিশালী ছিল যে মানুষ মুহূর্তেই আতঙ্কে রাস্তায় বের হয়ে আসে। শিশু, বৃদ্ধ, অফিস ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সবাই হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
ভূমিকম্পটি ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়। ইউএসজিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৭। এর কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই কম্পনই শহরের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। ঢাকার আকাশে ঝাঁকানো জানালা, দুলতে থাকা বৈদ্যুতিক তার, এবং দৌড়ন্ত মানুষ—এই দৃশ্য এক ভয়ঙ্কর মুহূর্তের পরিচয় দেয়।
ভূমিকম্পের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে পুরনো ও সংক্রমিত ভবনগুলোতে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে। আরমানিটোলার ছয় তলা ভবনটি হেলে পড়া শুধু স্থাপত্যগত ক্ষতি নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তার জন্যও সংকেত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা দ্রুত ভবনটি পরিদর্শন করতে গিয়েও ভয়বোধে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেন। কেউ বলেন, “ভূমিকম্পের কম্পন এমনভাবে অনুভূত হলো, মনে হলো পুরো ভবনটাই আমাদের ওপর এসে পড়বে।”
নিউমার্কেট, নাসিরাবাদ এবং মিরপুরের মতো ব্যস্ত এলাকা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আতঙ্কিত মানুষরা জরুরি নিরাপদ স্থানে চলে যান। দোকানপাট ও অফিস বন্ধ হয়ে যায়। গাড়ি চলাচলও অল্প সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও কিছু সময় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এমন পরিস্থিতি মানুষের জীবনে মুহূর্তে ভয় এবং অনিশ্চয়তার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
প্রসঙ্গত, ভূমিকম্প শুধু ঢাকাতেই সীমিত থাকেনি। পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলেও কম্পন অনুভূত হয়। জাতীয় ভূকম্পন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার গভীরে। স্থানীয়রা জানান, এই কম্পনও ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
এই বছরের মধ্যে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বড় ধরনের ভূমিকম্প। ৫ মার্চ রাজধানীতে একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল, যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬। এছাড়া ২৮ মে ভারতের মণিপুর রাজ্যের মোইরাং শহরের কাছে এক ভূমিকম্পও ঢাকার কিছু অংশে হালকা কম্পন সৃষ্টি করেছিল। এই ধারাবাহিক ভূমিকম্প দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ রাজধানী ঢাকায় মানুষের মধ্যে সতর্কতা ও উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানান, রিখটার স্কেলে ৫–৬ মাত্রার ভূমিকম্প প্রায়শই শহরের স্থাপত্যের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পুরনো ও যথাযথ মানের না থাকা ভবনগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত ঘটতে পারে। আরমানিটোলা এলাকার ছয় তলা ভবনটি হেলে পড়া এই সতর্কতার একটি উদাহরণ। তারা আরও বলেছেন, “মানুষকে আতঙ্কিত হওয়ার আগে সচেতন করা এবং নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা জরুরি।”
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের সময় শিশু, বৃদ্ধ এবং মহিলারা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়। কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গেই নিরাপদ স্থানে চলে যান, কেউবা আশেপাশের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। বিপর্যয়কালীন মুহূর্তে সহমর্মিতা ও সংহতি লক্ষ্য করা যায়। প্রতিবেশীরা একে অপরকে আশ্বস্ত করতে থাকেন এবং নিরাপদ স্থানে থাকার জন্য পরামর্শ দেন।
নিউজ মিডিয়ার বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ আতঙ্কিত হলেও সতর্কবার্তা ছড়াচ্ছেন। কেউ লিখেছেন, “এমন সময়ে বাইরে চলে আসা এবং নিরাপদ স্থানে থাকা জরুরি।” অন্য কেউ জানিয়েছেন, “আমাদের শহর কেঁপে উঠলো, আমরা আতঙ্কিত, কিন্তু সবাইকে ধৈর্য ধরে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দেওয়া দরকার।”
প্রশাসনও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। হেলে পড়া ভবনটির আশেপাশে কাঁটা বেড়া দিয়ে এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স এবং অন্যান্য জরুরি উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে শহরের পুরনো ভবনগুলোর স্থায়িত্ব পর্যালোচনা এবং জরুরি মেরামতির প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
রাজধানীর মানুষ আতঙ্কিত হলেও একসময়ে তা সামলানোর চেষ্টা করছেন। তারা সচেতনভাবে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেন। শিশুদেরকে নিয়ে পরিবারগুলো খোলা জায়গায় চলে আসে। দৃষ্টি দেয়ার মতো বিষয় হলো, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষের মানবিক সংবেদন ও সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটে।
সবমিলিয়ে, আরমানিটোলার ছয় তলা ভবন হেলে পড়া শুধু একটি ঘটনা নয়; এটি রাজধানীর জনজীবন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং নাগরিক সচেতনতার গুরুত্বকে সামনে এনেছে। এই ভূমিকম্প মানুষের মনে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা রেখে গেলেও সতর্কতা, সহমর্মিতা এবং দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হলো।
নগরবাসীর জন্য এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় কখনোই পূর্বাভাসহীন। তাই সতর্ক থাকা, নিরাপদ স্থানে অবস্থান করা এবং একে অপরকে সাহায্য করা অত্যন্ত জরুরি। আরমানিটোলার হেলে পড়া ভবন ও ঢাকার অন্যান্য স্থানে ফাটল ধরা ভবনগুলো এই শিক্ষারই জীবন্ত উদাহরণ।