প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে রাজধানী ঢাকা কেঁপে ওঠে। মিরপুর, নিউমার্কেট, আরমানিটোলা, গুলশান, মমিনপুরসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। রাজধানীর বাসিন্দারা হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় বের হন, শিশু, বৃদ্ধ ও মহিলারা একে অপরের হাত ধরে নিরাপদ স্থানে চলে যান। এই কম্পন শহরের উঁচু ভবন, পুরনো নির্মাণকাজ এবং জনবসতির সংমিশ্রণে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলেছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মিরপুরে এক অনুষ্ঠানে জানান, “গত পাঁচ বছরে আমি এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প দেখিনি। বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের অবশ্যই এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে।” তিনি বলেন, আজকের এই ভূমিকম্প শুধুমাত্র সুউচ্চ ভবনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ নয়; জলাশয় ভরা এলাকা, পাহাড় কাটা, ইটভাটাসহ অবৈধ নির্মাণও ঝুঁকিকে বাড়াচ্ছে।
রিজওয়ানা হাসান আরও বলেন, “একটি গোষ্ঠী মনে করে, তারা আইন মানবে না। কিন্তু এই কালচার থেকে সরে আসা এখন জরুরি। আমাদের উচিত জলাশয়, পাহাড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদকে সংরক্ষণ করা। এতে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে না, মানুষের জীবনও নিরাপদ থাকে।” তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, দেশের নগরায়ন ও পরিবেশগত অবস্থা যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
উপদেষ্টা বলেন, “আইন মেনে উচ্চ ভবন নির্মাণ করতে হবে। প্রতিটি ভবনের জন্য দুর্যোগের প্রস্তুতি নিতে প্রশিক্ষণ এবং পরিকল্পনা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অন্তত তিন বছরের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় মোকাবিলা করা যায়।”
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের গভীরতা ১০ কিলোমিটার। আবহাওয়াবিদরা এই ভূমিকম্পকে মাঝারি মাত্রার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এখন পর্যন্ত রাজধানীতে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু ভবন হেলে পড়েছে, যার মধ্যে আরমানিটোলা ও নিউমার্কেটের বেশ কয়েকটি পুরনো ভবন উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভূমিকম্পের মুহূর্তে শহরের অনেক মানুষ আতঙ্কে নিরাপদ স্থানে চলে আসে। দোকান, অফিস ও স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, গাড়ি চলাচলও অল্প সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। শিশুরা ঘর থেকে বের হয়ে খোলা জায়গায় নিরাপদ স্থানে চলে আসে, কেউ পরিবারের সাথে রাস্তায় দাঁড়ায়, আর কেউ আবার আশেপাশের খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন।
ভূমিকম্পের প্রভাব শুধু ঢাকাতেই সীমিত থাকেনি। পাকিস্তানেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার গভীরে অবস্থান করেছিল। এই কম্পনও ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, “প্রাকৃতিক বিপর্যয় অনিশ্চিত। তাই প্রতিটি মানুষকে প্রস্তুত থাকা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। আমাদের জন্য এখনই সময় আসে সতর্কতা, সচেতনতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের।”
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঢাকার মতো দখলকৃত শহরে ভূমিকম্পের ক্ষতি পুরনো ও অ-মানসম্পন্ন নির্মাণের ভবনে বেশি হয়। উঁচু ভবন এবং অবৈধ স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। এই কারণে সরকার এবং নগর পরিকল্পনাকারীদের অবিলম্বে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
নগরবাসীর অনুভূতিও মর্মস্পর্শী। কেউ বলেন, “হঠাৎ কম্পন এতটা ভয়ঙ্কর ছিল যে মনে হলো পুরো শহর কেঁপে উঠেছে। আমরা আতঙ্কে বাইরে বের হয়েছি।” শিশুরা অজান্তেই পরিবারের কাছে আশ্রয় খুঁজছে, বৃদ্ধরা নিরাপদ স্থানে দাঁড়িয়ে শ্বাস নিয়েছে, আর অফিস-দোকান কর্মীরা দ্রুত ভবন ত্যাগ করেছেন। শহরের মানুষ এক সাথে আতঙ্কিত হলেও, তারা একে অপরকে সাহায্য ও সতর্কবার্তা দিচ্ছেন।
প্রশাসনও দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। হেলে পড়া ভবনগুলো নিরাপদে খালি করা হয়েছে এবং আশেপাশের এলাকা কাঁটা বেড়া দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স এবং অন্যান্য জরুরি উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানাচ্ছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে শহরের পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে স্থায়িত্ব পরীক্ষা এবং জরুরি মেরামত কার্যক্রম আরও কঠোর করা হবে।
সবমিলিয়ে, শুক্রবারের এই ভূমিকম্প শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের নগরায়ন, নির্মাণ নীতি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং নাগরিক সচেতনতার গুরুত্বকে সামনে এনেছে। পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য এবং তার সতর্কবার্তা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে কখনো হালকাভাবে নেওয়া যায় না।
মানুষকে সচেতন থাকা, নিরাপদ স্থানে অবস্থান করা এবং একে অপরকে সাহায্য করা এখন সময়ের দাবি। এই ভূমিকম্পে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হেলে পড়া ভবন, মানুষের আতঙ্ক, প্রশাসনের তৎপরতা এবং ভুক্তভোগীদের মানসিক প্রতিক্রিয়া একসাথে মিলিয়ে একটি শিক্ষণীয় চিত্র উপস্থাপন করেছে, যা আগামী প্রজন্মের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে থাকবে।