প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে পাঁচজন, আহতের সংখ্যা শতাধিক। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুইজন শিশু রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের দেয়ার ধসে এক নবজাতক প্রাণ হারায়, আর নরসিংদীতে ওমর নামের এক শিশুর মৃত্যু ঘটে। রাজধানীর কসাইতলীতে পাঁচতলা ভবনের রেলিং ভেঙে পড়লে তিনজন পথচারী প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী রাফিউল (২০) এবং আরেকজন সবুজ (৩০)।
ভূমিকম্পের প্রভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের স্থাপত্যিক ক্ষতি এবং ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক আনঅফিশিয়াল ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন আহতকে ভর্তি করা হয়েছে, তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭২ জন, শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৩ জন, নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ৪৫ জন এবং ১০০ বেড হাসপাতালে ১০ জন আহতকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু গুরুতর আহতদের ভর্তি ও অন্যান্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মানুষ আতঙ্কে ছুটে বের হন। ভবনের ভেতরে থাকা লোকেরা দড়ি ধরে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। একাধিক ভবনে ফাটল দেখা দেয় এবং উচ্চ তলায় থাকা অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হিমশিম খায়। কসাইতলীর ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে মারাত্মক; সেখানে পাঁচতলা ভবনের রেলিং ভেঙে পড়ার ফলে তিনজন পথচারী ঘটনাস্থলেই মারা যান।
নারায়ণগঞ্জে দেয়ার ধসে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোক সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ধসের সময় পরিবারের সব সদস্য আতঙ্কিত হয়ে ছুটে যাচ্ছিলেন। আর নরসিংদীতে শিশু ওমরের মৃত্যু পরিবারের জন্য নিঃশেষ শোকের কারণ হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িঘর অতি দ্রুত দুলতে শুরু করে এবং শিশুটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর আগেই মারা যায়।
অভিযোগ রয়েছে যে বেশ কিছু ভবন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এই ধরনের দূর্ঘটনা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের প্রভাব কমানোর জন্য দেশের বড় শহরগুলোতে অতি জরুরি ভিত্তিতে ভূমিকম্প-সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা মান বজায় রাখতে হবে।
এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭ এবং এর কেন্দ্রস্থল নরসিংদীর মাধবদী এলাকায়। ভূমিকম্পটি দেশের বিভিন্ন জেলা, বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অনুভূত হয়েছে। গুগল আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তি নরসিংদীর ঘোড়াশাল থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে।
এ ঘটনায় রেসকিউ কার্যক্রম তৎপর হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। কুমিল্লা ইপিজেডে কাজ করা নারী শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্কের কারণে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়লেও, প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সতর্ক করেছেন, এমন ধরনের ভূমিকম্প নতুন নয়, গত পাঁচ বছরে এ ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্প পূর্বেও ঘটেছে। তিনি বলেন, শহরে উচ্চ ভবন নির্মাণের পাশাপাশি জলাশয় ভরা, পাহাড় কাটা ও ইটভাটা তৈরি করাও ভূমিকম্প ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়। তাই নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনকে প্রস্তুতি নিতে হবে।
শেখ রাসেল শিশু কিশোর কল্যাণ সংস্থা এবং স্থানীয় এনজিওগুলো আহতদের ত্রাণ এবং মানসিক সহায়তা প্রদানে কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে তারা পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতাল পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে এমন ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। নরসিংদী, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ এবং সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের প্রস্তুতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলেছেন, ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য স্থাপত্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
নাগরিকদেরকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার জন্য সচেতন হতে বলা হয়েছে। প্রশাসন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা তাদের হটলাইন নম্বর এবং সরকারি চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বার্তা দিয়েছেন, কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিতে কান না দেওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
ভূমিকম্পের প্রভাব মোকাবিলায় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আহতদের চিকিৎসা, ধ্বংসস্তুপ অপসারণ এবং নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। নিহত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এই দুর্ঘটনা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির অপরিহার্যতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিরাপত্তা ব্যবস্থা মান্য করতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনা নিতে হবে।