প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকাসহ দেশের তিন জেলায় ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে সাতজনের মৃত্যু দেশের মানুষকে নতুন করে গভীর শোক ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীকে কেন্দ্র করে অনুভূত এই কম্পনে মুহূর্তের মধ্যেই রাজধানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলায় মানুষজন নিরাপত্তাহীন আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড, কিন্তু তা যে ভয়াবহ দগদগে দাগ রেখে গেল, তার প্রমাণ মিলছে মৃত্যু ও আহতের খবরেই।
রাজধানীর পুরান ঢাকার বংশালে পাঁচতলা ভবনের রেলিং ধসে তিনজন পথচারীর মর্মান্তিক মৃত্যু এই ভূমিকম্পের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ঘটনাটি নিশ্চিত করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ ভবনটি দুলে উঠতেই পুরোনো রেলিংয়ের কিছু অংশ ভেঙে নিচে পড়ে যায় এবং নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া তিনজন তার নিচে চাপা পড়েন। তাদের মধ্যে একজন শিশু ছিল বলে জানানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের ঘটনা কতটা হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি করতে পারে, তা উপস্থিত মানুষদের আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়া দেখলেই বোঝা যায়। বহু মানুষ ভয়ে অজান্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং আশপাশের লোকজন দ্রুত এসে চাপা পড়াদের উদ্ধারে চেষ্টা চালান।
নারায়ণগঞ্জেও ভূমিকম্পের প্রভাব ছিল তীব্র। রূপগঞ্জ উপজেলায় দেয়াল ধসে একজন নারীর মৃত্যু হয়। তার সঙ্গে থাকা মেয়েটিও আহত হয় এবং স্থানীয়রা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। একই উপজেলায় একটি টিনসেড বাড়ির দেয়াল ধসে ফাতেমা নামে এক শিশুর মৃত্যু হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি করে। মাত্র এক বছরের এই শিশুটি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে এবং আশপাশের মানুষজন চেষ্টা করলেও তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনায় শিশুটির মা ও প্রতিবেশী জেসমিন বেগম আহত হন। মূহুর্তের ওই কম্পন কতটা ভয়ানক আঘাত হেনেছিল, তা এই অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটে যাওয়া একাধিক দেয়াল ধসের ঘটনাই প্রমাণ করে।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে পরিস্থিতি ছিল আরও জটিল। জেলার সদর উপজেলার গাবতলী এলাকায় একটি বাড়ির সানসেট ভেঙে ওমর নামে ১০ বছরের এক শিশু মারা যায়। তার বাবা গুরুতর আহত হওয়ায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং প্রতিবেশীরা জানান, সকালবেলার স্বাভাবিক সময়েই শিশু ওমর বাড়ির সামনে খেলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই কম্পনে সানসেট হেলে পড়লে মৃত্যুর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। একই জেলায় পলাশ উপজেলার মালিতা গ্রামে মাটির দেয়াল ধসে ৭৫ বছর বয়সী কাজম আলী নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। ভূমিকম্পের তীব্রতায় পুরোনো মাটির দেয়াল ভেঙে পড়লে তিনি বের হতে পারেননি বলে স্থানীয়দের ধারণা। জেলায় আরও অন্তত ৫৫ জন আহত হন—অনেকে ছাদের রেলিং বা দেয়াল ভাঙার ধাক্কায় আহত হয়েছেন বলে জানা যায়।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্পের অনুভূতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই ঘর-বাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। স্কুল, অফিস, শপিংমল, রিকশা-স্ট্যান্ড—যেখানেই মানুষ ছিলেন, সেখান থেকেই ছুটে রাস্তায় নামার চিত্র দেখা যায়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই বিভিন্ন স্থানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে মানুষজনকে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় দৌড়ে বাইরে বেরোতে দেখা যায়।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রবণ এলাকার মধ্যে হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্যোগ প্রস্তুতি, ভবন নিরাপত্তা ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। আজকের ঘটনা সেই সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে। বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার মতো এলাকা, যেখানে ভবনগুলোর বয়স অনেক বেশি এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে দুর্যোগের ঝুঁকি সবসময়ই বেশি। ভবনগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়।
ভূমিকম্পের পরপরই ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ মিলে উদ্ধারকাজ শুরু করে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসকেরা জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে সেবায় নিয়োজিত হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো দেয়াল ধস, ছাদের পলেস্তরা খসে পড়া, বহুতল ভবনে দুলুনি, বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া—এসব ঘটনায় সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানতে এখনও সময় লাগবে।
সারা দেশের মানুষের মন এখন আতঙ্কে আচ্ছন্ন। অনেক পরিবার ঘরে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভূমিকম্পের পরে বিভিন্ন এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি টহল দিতে দেখা গেছে এবং মসজিদ-মন্দিরসহ ধর্মীয় স্থানগুলোতেও মানুষ নিহতদের জন্য দোয়া ও প্রার্থনায় সময় কাটাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ ও আহতদের দ্রুত সুস্থতার কামনায় অনেকেই পোস্ট দিচ্ছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন চলছে এবং ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জরুরি ভিত্তিতে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর একাধিক মনিটরিং টিম গঠন করেছে এবং তারা ঘটনাস্থলগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
এমন দুর্যোগের মুহূর্ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অল্প সময়ের একটি কম্পনও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আজকের ঘটনাটি দেশের দুর্যোগ প্রস্তুতি ব্যবস্থায় আরও উন্নয়ন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। নিহত সাতজনের পরিবারে যে শোক নেমে এসেছে, তা কোনোভাবেই পূরণ করার মতো নয়। তবুও প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা হয়তো ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষয়ক্ষতি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।