সিলেবাসের বাইরের পড়ালেখার জগৎ কতটা বিস্তৃত হতে পারে—স্কুলজীবনেই সেই উপলব্ধি হয়েছিল সোহরাব আলীর। তখনই তিনি বুঝেছিলেন, বইয়ের জগত সীমাহীন, কিন্তু পাঠ্যপুস্তকের জগৎ সীমাবদ্ধ। তাই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা না বেছে, নিজের মতো করে পথ তৈরি করেছিলেন তিনি। এখন তাঁর বয়স ৭২। তবু চোখে-মনে কৌতূহল আগের মতোই জাগ্রত। কৃষকের জীবনযাপন সামলিয়ে তিনি ডুব দিয়েছেন বিশ্বসাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, ইতিহাস আর মানুষের মুক্তির চিন্তায়। শুধু নিজে শেখেননি—কৃষক-শ্রমিকদেরও শিখিয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন, পাঠক বানিয়েছেন, কলম ধরেছেন তাদের গান লিখতে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার মাদারীপুর (জমসেরপুর) গ্রামের এই কৃষক জানেন, জ্ঞানই পারে মানুষকে মুক্ত করতে। তাই মোটা মোটা দর্শনের বই, বিশ্বসাহিত্য কিংবা ইতিহাস—সবই তিনি গরিব কৃষকদের হাতে তুলে দিয়েছেন। যে মানুষ কখনো স্কুলের গন্ডি পেরোননি, তাকেও তিনি বানিয়েছেন বইপাগল পাঠক। তাঁর মতে, কৃষককে সত্যিকারের শিক্ষিত করে তুললেই বদলাবে সমাজ।
গান লিখেছেন অন্তত পঞ্চাশের বেশি। শুধু গান নয়—এগুলো গণসংগীত, মানুষের গান, শ্রমের গান। স্থানীয় শিল্পীরা যখন মঞ্চে তাঁর লেখা গাইতে শুরু করেন—“কাস্তে হাতুড়ি আর গাঁইতি হাতে, দল বেঁধে ছুটি একই সাথে”—তখন বোঝা যায়, এসব গান শুধু কাগজে নয়, মানুষের জীবনে জায়গা করে নিয়েছে। আরেক শিল্পী সুর তুললেন, “বারবার আসে প্লাবন খেয়ে যায় সোনার ধান, পানির দামে বেচাকেনা হয়…”। কৃষকের চোখের জল, শ্রমিকের ঘাম—সবই ধরা পড়ে তাঁর কথায়।
এমন একজন মানুষের কাছে গিয়ে দেখা গেল, তাঁর গানের পাণ্ডুলিপি নেই বইয়ের মতো পরিপাটি। অনেক গান সিগারেটের খালি প্যাকেটে লেখা, কখনো ছেঁড়া কাগজে। কোনোটাই ঠিকমতো সাজানো নেই। কোনো একসময় তাঁর স্ত্রী অনেকগুলো লিখা ফেলে দিয়েছিলেন, ভেবে সেগুলো মূল্যহীন। তাই আজ তাঁর বহু গান নেই হাতে—যেগুলো আছে, সেগুলো স্থানীয় শিল্পীদের মুখে-মনে।
যে মানুষ নিজে গানের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন বই, তার ঘরে রেখেছেন ছয় শতাধিক বইয়ের সংগ্রহ। তবে এর মাত্র একশ তার নিজের ঘরে থাকে, বাকি পাঁচ শতাধিক বই ঘুরে বেড়ায় পাঠকের বাড়িতে। কোনো বই কাকে দিয়েছেন তার হিসাবও রাখেন না সবসময়। সাম্প্রতিক একটা ঘটনা তিনি হাসিমুখে বলছিলেন—আরজ আলী মাতুব্বরের ‘চিন্তার জগৎ’ বইটি দুই বছর পর এক পাঠক ফেরত দিলেন। একই দিনে ফেরত পেলেন হায়দার আকবর খান রনোর ‘ফরাসি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব’। বই দুটো ফেরত নিতে তাঁকে তানোর থেকে রাজশাহী শহর ছুটে যেতে হয়েছে, কিন্তু তাতে তাঁর কোনো বিরক্তি নেই। তাঁর কাছে বই হলো বীজ—যেখানে রোপণ করবেন, সেখানেই একটা নতুন পাঠকের জন্ম হবে।
কথা বলতে বলতে দেখা গেল তাঁর প্রিয় পাঠক সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিক। যে মানুষ কোনোদিন স্কুলে যাননি, তিনিই আজ দর্শনের বই পড়ে ব্যাখ্যা করেন। সোহরাবের কাছে হয়তো এটিই বড় অর্জন—একজন মানুষকে পাঠক বানানো। মাটির ঘরের খাটে বসে সত্যেন পড়ছিলেন ‘শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া’। ঘরের এক পাশে সাজানো ‘ভারতীয় দর্শন’, আরজ আলী মাতুব্বর, রুশোর ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’, রবীন্দ্রনাথের ‘জাপান যাত্রী’, এমনকি ‘দ্য ক্যাপিটাল’।
এই বইপাগল কৃষকের মনোবৃত্তি গঠনে ছোটবেলার একটি গল্প গভীর ছাপ ফেলেছিল—‘চোরের আত্মকাহিনী’। শিশুর মুখে চোরের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে শিখিয়েছিল, মানুষ কখনো পুরোপুরি মন্দ নয়, পরিস্থিতি মানুষকে বদলায়। সেই মানবিকতা থেকেই হয়তো একসময় তিনি নিজের ঘর থেকে চাল চুরি করে দিয়ে আসতেন পাশের দরিদ্র হাড়িপাড়ায়—কেউ না খেয়ে থাকলে তাঁর খেতে ভালো লাগত না। এই গল্প বলতে বলতে তিনি আবার মনে করিয়ে দেন ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারেব্ল’–এর জাঁ ভ্যালজাঁকে—একটি রুটি চুরির কারণে যে মানুষটি ১৯ বছরের কারাবরণ করেছিলেন।
রাজনীতি আর বিপ্লবীদের জীবনও তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কার্ল মার্ক্স থেকে লেনিন, স্টালিন থেকে মাও সেতুং, চে–কাস্ত্রো থেকে লিংকন—সবাইকে তিনি পড়েছেন, বোঝার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় উপন্যাস পড়েছি বেসুমার। এখন দর্শন ছাড়তে ভালো লাগে না।”
তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে—সবাই সংসারী। অথচ তিনি একাই থেকে গেছেন দেড় শ বছরের পুরোনো মাটির বাড়িতে। পরিবারের অন্য ১১ জন সদস্য আলাদা বাড়ি করেছেন, কিন্তু এই কৃষক-পাঠক-লেখকের মনে টানে পুরোনো আঁধারটা। বলেন, “আমি তো চাষার ছেলে, চাষাই। এই মাটির সঙ্গে বন্ধন আমার।”
এ মানুষটির জীবন যেন একটাই বিশ্বাসকে বারবার সামনে আনে—শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেট নয়, একটা আলোকিত মন। আর সেই আলোকটা তিনি ছড়িয়ে যেতে চান যতদিন সম্ভব—গ্রামে, মাঠে, কৃষকের হাতে, শ্রমিকের গানে।