চট্টগ্রামের ৭০% ভবন ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার
চট্টগ্রামের ৭০% ভবন ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম নগরীর অন্তত ৭০ শতাংশ ভবন ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো মুহূর্তে ৭-৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বিপুলসংখ্যক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এলাকার ভবনগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। রিয়াজউদ্দিন বাজার, খাতুনগঞ্জ, নিউ মার্কেট, স্টেডিয়াম, হাজারী গলি ও বহদ্দারহাটের মতো এলাকাগুলোতে ভূমিকম্পের সময় ব্যাপক ধ্বংসের আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, নগরীতে ইমারত নির্মাণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, সয়েল টেস্ট ছাড়া নির্মাণ করা, দুর্বল ফাউন্ডেশন ও ঘনবসতি ভবনগুলোর ঝুঁকি ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। ঢাকায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের মতো কোনো কম্পন চট্টগ্রামে হলে ঘিঞ্জি এলাকায় বহু ভবন ধসে যেতে পারে।

গত শুক্রবার সকালে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী কম্পনে চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিংয়ের মনসুরাবাদ মিয়াবাড়ি সড়কের একটি ছয়তলা ভবন পাশের ভবনের দিকে হেলে পড়ে। একই দিন চট্টগ্রামে মোট চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হলে নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রিয়াজউদ্দিন বাজার, হাজারী গলি ও টেরিবাজারের মানুষ সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন।

হাজারী গলির একজন ব্যবসায়ী জানান, বহু বছর ধরে এই এলাকার ভবনগুলোর কোনো বিধি মানা হয়নি। প্রতিটি ভবনই পাশের ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত। এতে অগ্নি ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি ভূমিকম্পের সম্ভাব্য প্রভাবও প্রকট।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে বর্তমানে তিন লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে দুই লাখ ৬৭ হাজার ভবন মাঝারি মাত্রার কম্পনেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৯৪টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা সিটি করপোরেশনকে পাঠানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অনেক ভবন মালিক ঝুঁকি অস্বীকার করেন বা ভাঙার খরচ দিতে অনিচ্ছুক। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো আগের মতোই থেকে গেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি সুভাষ বড়ুয়া জানান, চট্টগ্রামের ৭০ শতাংশ ভবন সয়েল টেস্ট ছাড়া নির্মিত। এর ফলে ফাউন্ডেশন দুর্বল হয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের নজরদারি ঘাটতি এবং কর্তব্যে অবহেলার কারণে এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় মাটি এতটাই দুর্বল যে, ৫ মাত্রার উপরে কোনো কম্পন হলে ভবনগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। নতুন জরিপে দেখা গেছে, নগরের ৩২টি ওয়ার্ড উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোনে পড়ে।

শুধু আবাসিক ভবন নয়, চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত বিমানবন্দর, ইস্টার্ন রিফাইনারি, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও হুমকির মুখে। নগরের এক হাজার ৩৩টি স্কুলের মধ্যে ৭৪০টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানা গেছে। বড় ভূমিকম্পে সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোতেও ব্যাপক ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

চুয়েটের সাবেক উপাচার্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ভবন নির্মাণে আইন না মানা এবং তদারকির অভাব চট্টগ্রামকে ভূমিকম্পের অতিমাত্রার ঝুঁকিতে ফেলেছে। এছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি এখনও স্বচ্ছল নয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, পুরোনো ভবন, অনিয়ন্ত্রিত বহুতল নির্মাণ এবং দুর্বল ফাউন্ডেশন মিলিয়ে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও ভয়াবহ প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সচেতন মহল বলছে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তবে দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার প্রস্তুতি অত্যন্ত দুর্বল। ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন এবং সিডিএ—কোনও সংস্থার যথেষ্ট সরঞ্জাম বা প্রশিক্ষিত দল নেই। এমনকি উদ্ধারকারী যান ঢোকার সুযোগও অনেক এলাকায় থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, দ্রুত পরিকল্পনা ও আইনগত কার্যক্রম ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো বড় ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। এ কারণে নগরীতে পুনর্বাসন, জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নির্মাণ মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ জানিয়েছেন তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত