নিরাপত্তা উদ্বেগে নেতানিয়াহুর ভারত সফর আবার বাতিল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৩ বার
নিরাপত্তা উদ্বেগে নেতানিয়াহুর ভারত সফর আবার বাতিল

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসরাইল ও ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্রতার মাঝে আবারও তৈরি হলো নতুন অনিশ্চয়তা। চলতি বছরে তৃতীয়বারের মতো ভারত সফর বাতিল করলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নয়াদিল্লিতে সাম্প্রতিক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম। বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক অগ্রগতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আসন্ন নীতিনির্ধারণী আলোচনার গতিকে মন্থর করে দিতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

ভারতের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো ইসরায়েলের আই২৪ নিউজের বরাতে জানিয়েছে, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলার পর নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন শুরু করেছে ইসরাইলি প্রশাসন। সেই মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুর সফর স্থগিত রাখতে চাইছে তেল আবিব। যদিও ঠিক কবে নাগাদ সফরটি পুনরায় নির্ধারণ হতে পারে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ধারণা করা হচ্ছে, সফরটি আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে।

এর আগে চলতি বছরের শেষের দিকেই নয়াদিল্লিতে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করার কথা ছিল নেতানিয়াহুর। দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ইসরাইল–ভারত যৌথ প্রযুক্তি গবেষণা, কৃষিখাতে উদ্ভাবন এবং পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল এই বৈঠকে। কিন্তু বছরজুড়ে তিনবার সফর বাতিল হওয়ায় তা এখন কার্যত অনিশ্চিত রূপ নিয়েছে।

ইতিহাস বলছে, নেতানিয়াহুর ভারত সফর বহুবার রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থগিত হয়েছে। এ বছরের ৯ সেপ্টেম্বর এক দিনের জন্য দিল্লি আসার কথা থাকলেও, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পুনর্নির্বাচন ঘিরে ব্যস্ততার কারণে তিনি সফরটি বাতিল করেন। তারও আগে এপ্রিলে অনুষ্ঠিতব্য ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে নির্ধারিত সফর বাতিল হয়। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে ভারত ইসরাইলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগী দেশ—যার গুরুত্ব কোনোভাবেই কম নয়।

এ প্রসঙ্গে ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দিল্লির সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তেল আবিবকে অতিরিক্ত সতর্ক হতে বাধ্য করেছে। বিশ্বের যেসব শহর সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিতে থাকে, সেসব স্থানে উচ্চপ্রোফাইল সফরে ইসরায়েল সবসময় কঠোর নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করে। দিল্লির সদ্য সংঘটিত হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর প্রভাব পড়েছে নেতানিয়াহুর সফরসূচিতে।

ভারত–ইসরাইল সম্পর্ককে ঘিরে এই বাতিলকরণকে শুধু আনুষ্ঠানিক সফর স্থগিতের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। উভয় দেশ বহু বছর ধরে সন্ত্রাস দমন, আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়, সাইবার সিকিউরিটি, কৃষি প্রযুক্তি ও জল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। মোদি–নেতানিয়াহু বৈঠকগুলো সেই যৌথ কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবসময়ই বহুল আলোচিত ছিল। বিশেষ করে ২০১৭ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরাইল সফর উভয় দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল—যা ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ইসরাইল সফরের প্রথম দৃষ্টান্ত।

এ ছাড়া ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে নেতানিয়াহুর ভারত সফর দুই দেশের মধ্যে উষ্ণ কূটনৈতিক বন্ধনকে নতুন করে দৃঢ় করেছিল। সেই সফরের সময় বেশ কিছু সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি হস্তান্তর, কৃষি উদ্ভাবন প্রকল্প এবং ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাই চলতি বছর তিনবার সফর বাতিল হওয়ায় অনেকেই বিষয়টিকে দুই দেশের কৌশলগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনায় একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিল্লির সাম্প্রতিক হামলা শুধু রাজধানীতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ইসরাইল, যাদের নিরাপত্তা নীতি অত্যন্ত কঠোর ও ঝুঁকি–বিমুখ, তারা এ ধরনের ঘটনা সাধারণত খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এজন্য সফর পিছিয়ে দেওয়া ছাড়া তাদের কাছে বাস্তবসম্মত আর কোনো বিকল্প ছিল না।

অন্যদিকে ভারত সরকার এখনো নেতানিয়াহুর সফরস্থগিত সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তারা পরিস্থিতি বুঝে সংলাপের নতুন সময়সূচি নির্ধারণে কাজ করছে। ভারতের পক্ষ থেকেও আশা করা হচ্ছে—নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে দুই দেশের সম্পর্ক আগের গতিতে ফিরে আসবে।

বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল–ভারত সম্পর্ক শুধু দ্বিপাক্ষিক স্বার্থেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান, উপসাগরীয় দেশসমূহ এবং ওয়ার্ল্ড পলিসির নানামুখী চাপ বিবেচনায় ভারত–ইসরাইল সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়া সময়ের দাবি। তাই নেতানিয়াহুর এই সফর বাতিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও সতর্ক করে বলেছেন, দিল্লির সাম্প্রতিক হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উচ্চপ্রোফাইল আন্তর্জাতিক সফর কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর ক্ষেত্রে ভারতকে নিরাপত্তা নীতি আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভারতের রাজধানীকে নিরাপদ হিসেবে দেখতে চায়।

সবশেষে বলা যায়, নেতানিয়াহুর সফরস্থগিত সিদ্ধান্ত ভারত–ইসরাইল সম্পর্কের সামগ্রিক দিক পরিবর্তন করবে না। তবে এটি বর্তমান ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, নিরাপত্তা ঝুঁকি, এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা—সবকিছুরই যৌথ প্রতিফলন। নতুন সময়সূচি নির্ধারণে কূটনৈতিক আলাপ–আলোচনা অব্যাহত থাকবে, এমনটাই ভাবছেন উভয় দেশের বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত