আবুধাবিতে রাশিয়া–ইউক্রেন শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের গোপন মধ্যস্থতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৭ বার
আবুধাবিতে রাশিয়া–ইউক্রেন শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের গোপন মধ্যস্থতা

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলমান রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা যেমন মানবিক বিপর্যয় বাড়িয়ে চলেছে, তেমনি অর্থনীতি থেকে নিরাপত্তা—সবখানেই এর প্রভাব বিস্তৃত। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবার শান্তি প্রক্রিয়াকে নতুন গতিতে এগিয়ে নিতে গোপনে উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলমান যুদ্ধের অবসান এবং আলোচনার নতুন কাঠামো তৈরির লক্ষ্য নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে গোপন বৈঠকের আয়োজন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যায় আবুধাবিতে পৌঁছান মার্কিন সেনা সচিব ড্যান ড্রিসকল। রাতেই রুশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তাঁর বৈঠক শুরু হয় এবং মঙ্গলবারও আলোচনা অব্যাহত থাকে। বৈঠকের সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্র জানায়, রাশিয়া যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে এখন নতুনভাবে আলোচনায় আগ্রহী এবং যুক্তরাষ্ট্রও এই মুহূর্তে সংঘাতের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, চলমান যুদ্ধ শুধু ইউরোপেই নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলছে, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

ফিনান্সিয়াল টাইমস লিখেছে, রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর ড্যান ড্রিসকল ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান কিরিলো বুদানভের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও এই তিন পক্ষ একই টেবিলে বসছে, নাকি পৃথকভাবে আলোচনা চলছে—তা নিশ্চিতভাবে কেউ জানাতে পারেনি। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র এখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু করাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা জোরদার করেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ২৮ দফা একটি শান্তি প্রস্তাব ইউক্রেনের হাতে তুলে দেয়, যা গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তিন পক্ষের আলোচনায় ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আলোচনার পর জানান, প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে দারুণ অগ্রগতি হয়েছে; তবে আরও কিছু জায়গায় কাজ বাকি রয়েছে। তিনি বলেন, কিছু শর্ত এখনও পর্যালোচনায় আছে এবং সেগুলো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে আরও কয়েক দফা বৈঠক প্রয়োজন।

অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন তাদের মতামত শুনছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, শান্তি আলোচনায় ইউক্রেনের অবস্থান সুস্পষ্ট: ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। তবে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলে ইউক্রেন তা বিবেচনা করতেই পারে।

ফাঁস হওয়া শান্তি প্রস্তাবের কয়েকটি শর্ত নিয়ে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা গেলেও রাশিয়া এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রস্তাবকে ‘সম্ভাব্য সমাধানের ভিত্তি’ বলে উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়াও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ অনুভব করছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

এদিকে আবুধাবিতে গোপন এই বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌতূহল বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত অতীতে বহু আন্তর্জাতিক ইস্যুতে নীরব কূটনৈতিক মধ্যস্থতা করেছে। এবারও তাদের ভূমিকা গোপন আলোচনার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা—যেখানে পশ্চিমা ও রুশ উভয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক—এ ধরনের বৈঠকে আমিরাতকে আদর্শ স্থান হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

চলমান যুদ্ধ ইতোমধ্যেই ১০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। ইউক্রেনের বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং রাশিয়াও সামরিক ব্যয়ের চাপে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। শান্তি প্রক্রিয়ার যেকোনো অগ্রগতি কেবল দুটি দেশকেই নয়, পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আবুধাবির বৈঠক তাই কেবল একটি কূটনৈতিক আয়োজন নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য শান্তির রূপরেখা তৈরির বড় পদক্ষেপ।

যদিও আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেরা মনে করছেন, রাশিয়া–ইউক্রেন সংকট সমাধানে এমন মধ্যস্থতা-নির্ভর আলোচনাই ভবিষ্যতে নতুন পথ দেখাতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কেবল সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা নয়, মানবিক বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাই এমন উদ্যোগকে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।

বৈঠক সফল হলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার দরজা আবারও খুলে যেতে পারে। তবে আলোচনার সব শর্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রশ্ন—এগুলোই ভবিষ্যৎ শান্তির প্রকৃত রূপরেখা নির্ধারণ করবে। এখন নজর আবুধাবিতে—যেখানে যুদ্ধের আগুন নেভানোর জন্য আলোচনার আলো কতটা উজ্জ্বল হয়, সেটাই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত