বাজেটে এবারও থাকছে কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
  • ৪ বার
kalo taka shada korar shujog

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আবারও অপ্রদর্শিত আয় বা বহুল আলোচিত ‘কালোটাকা’ বৈধ করার সুযোগ রাখা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অর্থনীতিতে স্থবির হয়ে থাকা অর্থকে মূলধারায় আনা, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার এ সুযোগ অব্যাহত রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আবারও শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা ও বিতর্ক।

দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই অপ্রদর্শিত অর্থের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সময় সরকার বিশেষ শর্তে এই অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিয়েছে। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আবাসন খাতকে চাঙা করা, শিল্পায়নে গতি আনা এবং করজালের বাইরে থাকা অর্থকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনা। তবে সমালোচকদের মতে, এ ধরনের সুযোগ নিয়মিত দেওয়া হলে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন এবং কর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি হিসাব না থাকলেও এর আকার উল্লেখযোগ্য। ব্যবসা-বাণিজ্য, জমি-বাড়ি কেনাবেচা, বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং কর ফাঁকির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। সরকার মনে করছে, নির্দিষ্ট কর বা জরিমানা পরিশোধের মাধ্যমে এসব অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিলে তার একটি অংশ হলেও অর্থনীতির মূলধারায় ফিরে আসবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন বাজেটে কালোটাকা বৈধ করার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আরোপ করা হতে পারে। বিশেষ করে আবাসন, শিল্প খাত, পুঁজিবাজার কিংবা উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে অর্থ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হতে পারে। সরকার চায়, শুধু অর্থ বৈধ করাই নয়, বরং সেই অর্থ যেন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

তবে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ বা রাজস্ব বৃদ্ধি সবসময় অর্জিত হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে অসাধু উপায়ে আয় করা ব্যক্তিরা তুলনামূলক কম খরচে অর্থ বৈধ করার সুযোগ পেয়েছেন, যা কর ন্যায্যতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি আধুনিক ও কার্যকর করব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সমতা। যারা নিয়মিত কর পরিশোধ করেন এবং আইন মেনে চলেন, তাদের তুলনায় কর ফাঁকিদাতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে কর সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করে, বাস্তব অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ বিদ্যমান থাকায় সেটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তারা বলছেন, উপযুক্ত নীতি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এ অর্থকে উৎপাদনমুখী খাতে নিয়ে আসা গেলে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কালোটাকা বৈধ করার নীতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিভিন্ন দেশ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর ক্ষমা কর্মসূচি বা অ্যামনেস্টি স্কিম চালু করেছে। কোথাও তা সফল হয়েছে, আবার কোথাও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করে কঠোর নজরদারি, পরবর্তী সময়ে কর আইন বাস্তবায়ন এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধের সক্ষমতার ওপর।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ উৎসাহিত করার বিভিন্ন পথ খুঁজছে। কালোটাকা বৈধ করার সুযোগকে সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ দিলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। এর পাশাপাশি কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল নজরদারি বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় একই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে এবং অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।

সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, অপ্রদর্শিত অর্থের উৎস যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলে তা নৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং আইনগত কাঠামো অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এদিকে বাজেট ঘোষণার আগে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং করদাতাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, এবার কী শর্তে কালোটাকা বৈধ করা যাবে, কত হারে কর দিতে হবে এবং কোন কোন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে। বাজেট ঘোষণার পর এসব বিষয়ে বিস্তারিত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে আবারও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হচ্ছে—এমন ইঙ্গিত অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সরকার যেখানে অর্থনীতিতে স্থবির অর্থকে মূলধারায় আনার যুক্তি দিচ্ছে, সেখানে সমালোচকরা কর ন্যায্যতা ও সুশাসনের প্রশ্ন তুলছেন। ফলে বাজেটের এই উদ্যোগ আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতি ও জনপরিসরে অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হতে পারে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত