জলঢাকায় নদীতে অসাধু জেলেদের ‘আইপিএস’, বিলুপ্তির পথে দেশি মাছ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
  • ৬ বার
jaldhaqka_news_pic

সংবাদ বিভাগ: পরিবেশ / মৎস্য সম্পদ / স্থানীয় প্রতিবেদন

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় নদ-নদীতে অবৈধ বিদ্যুৎচালিত শকিং ডিভাইস বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘আইপিএস’ ব্যবহার করে মাছ শিকারের অভিযোগে দেশি মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় জেলেরা ও মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের নিষিদ্ধ প্রযুক্তির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে অচিরেই নদীর দেশি মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছু অসাধু জেলে রাতের আঁধারে নদীতে বিদ্যুৎচালিত শকিং ডিভাইস ব্যবহার করে মাছ নিধন করছে। এই পদ্ধতিতে পানিতে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে মাছ অচেতন করা হয়, ফলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ছোট-বড় মাছ ধরা পড়ে। তবে এই প্রক্রিয়ায় শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মাছ নয়, ডিম ও পোনা মাছও ধ্বংস হয়ে যায়, যা ভবিষ্যৎ প্রজনন চক্রকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের শিকার পদ্ধতি পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। নদীর প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্যও ভেঙে পড়ছে। এর ফলে রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং, মাগুর, বোয়ালসহ বহু দেশি প্রজাতির মাছের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

স্থানীয় জেলেরা অভিযোগ করেছেন, কিছু প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এই অবৈধ কার্যক্রম চলছে। রাতের বেলা নৌকায় করে নদীতে গিয়ে তারা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি ও ইনভার্টার ব্যবহার করে পানিতে বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি করছে। অনেক সময় সাধারণ জেলেরা প্রতিবাদ করতে গেলে তারা হুমকির মুখে পড়েন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জলঢাকা এলাকার এক জেলে বলেন, “আগে নদীতে জাল ফেললেই দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন কয়েক ঘণ্টা বসে থাকলেও আগের মতো মাছ মেলে না। যারা আইপিএস দিয়ে মাছ ধরছে, তারা একবারে সব শেষ করে দিচ্ছে।”

মৎস্য অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ যন্ত্রপাতি জব্দ এবং জরিমানাও করা হয়েছে। তবে নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা ও রাতের আঁধারে এই কার্যক্রম চলায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

একজন মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, “শকিং পদ্ধতিতে মাছ ধরা শুধু অবৈধই নয়, এটি পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ মৎস্য উৎপাদনের জন্য ভয়াবহ হুমকি। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি, তবে স্থানীয় সহযোগিতা ছাড়া এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।”

পরিবেশবিদরা বলছেন, নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হলে এর প্রভাব শুধু মৎস্য সম্পদেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশি মাছ কমে গেলে সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।

তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ এবং অবৈধ শিকার একসঙ্গে মিলে উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বিপর্যস্ত করছে। এর সঙ্গে শকিং ডিভাইসের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নদীতে অবৈধ বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র ব্যবহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, জেলে নিবন্ধন এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশি মাছ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে প্রজনন মৌসুমে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অভয়াশ্রম সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় জেলেদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

সব মিলিয়ে জলঢাকার নদীগুলোতে অবৈধ ‘আইপিএস’ ব্যবহারের প্রবণতা এখন কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের মৎস্য সম্পদ ও পরিবেশগত নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত