রাজশাহীর চার আসনে বিএনপির প্রার্থী বাছাই নিয়ে তীব্র অস্থিরতা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ বার
রাজশাহীর চার আসনে বিএনপির প্রার্থী বাছাই নিয়ে তীব্র অস্থিরতা

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন রাজশাহী জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দলীয় অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। দলীয় নেতা ও তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় নিজেদের মতামত উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী), রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর), রাজশাহী-৪ (বাগমারা) ও রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে এই অস্থিরতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তানোর-গোদাগাড়ী আসনের প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করছেন, তিনি দলের কঠিন সময়ে এলাকায় অনুপস্থিত ছিলেন এবং নির্দেশনা মানার ক্ষেত্রে ত্রুটি প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়রা এমনকি প্রতীকী প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ‘কাফনের কাপড়’ পরে বিক্ষোভ জানাচ্ছেন। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, শরিফ উদ্দিন স্থানীয় আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এ আসনে দলের জয়ের সম্ভাবনা কমে এসেছে। তারা সুলতানুল ইসলাম তারেককে এই আসনের জন্য প্রার্থী করার দাবি করছেন। এলাকার বিভিন্ন নেতাকর্মী জানান, শরিফ উদ্দিন ২০২৪ সালের আগস্টের আগে এলাকায় উপস্থিত হননি। এছাড়া তার বিএনএম মনোনয়ন গ্রহণ নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে। এসব কারণে তাঁকে নির্বাচনে প্রার্থী করা হলে দলীয় সমর্থন হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পবা-মোহনপুর আসনের প্রার্থী শফিকুল হক মিলনকেও ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে স্থানীয়রা তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন, মশাল মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। যদিও মিলন দাবি করেছেন, ২০১৩ সাল থেকে তিনি এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশেছেন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে তার নিশ্চিত বিজয় ‘ছিনিয়ে নেওয়া’ হয়েছিল। মনোনয়নবঞ্চিত রায়হানুল হক জানান, এলাকার মানুষ চায় যে তাদের এমপি হবেন স্থানীয় কেউ, যিনি বিপদ-আপদে পাশে থাকবে। তৃণমূল নেতারা এ আসনে প্রার্থী বদলের দাবিতে অনড় রয়েছেন।

বাগমারা আসনে ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া প্রতীকী প্রার্থী হলেও তার বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাকর্মীরা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, দলবিরোধী কার্যকলাপ এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী লালন-পালনের অভিযোগ তুলেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তার ভাইকেও সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ কারণে ৩৭ জন পদধারী নেতা একযোগে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে লিখিত অভিযোগ করে তার মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। ‘ডিএম জিয়া ঠেকাও’ মনোভাব এলাকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

পুঠিয়া-দুর্গাপুর আসনের প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডলের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অতীতে ধানের শীষের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে ‘আঁতাত’ করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, তিনি গত ১৭ বছর ধরে দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন না। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি ধানের শীষের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছিলেন এবং ২০১৮ সালে হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে দলের প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন করেছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আব্দুল মজিদ বলেন, “যে দলেরই হোক, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে মনোনয়ন দিলে নির্বাচনের আগেই দলে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়। রাজশাহীর চার আসনে সেটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।” আরেক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন জানান, প্রার্থী নির্ধারণের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং তৃণমূলের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা বিএনপির জন্য নির্বাচনি মাঠে ঐক্য বজায় রাখা কঠিন করে দিচ্ছে।

মনোনয়ন বিতর্কের প্রভাব শুধুমাত্র নেতাকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সাধারণ ভোটাররাও হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার ভোটাররা জানিয়েছেন, হঠাৎ প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ায় তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তানোরের একজন শিক্ষক বলেন, “দল যখন মাঠে টিকে থাকার লড়াই করছে, তখন ভুল ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে তা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছুই নয়।”

পবা-মোহনপুরের ভোটাররা মন্তব্য করেছেন, “বিএনপি যদি নিজ ঘরের মানুষকে এক করতে না পারে, তাহলে নির্বাচনে জনগণকে এক করবে কীভাবে?” বাগমারা ও পুঠিয়া-দুর্গাপুরের একাংশ ভোটার মনে করছেন, মনোনয়ন নিয়ে এ অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল নির্বাচনের আগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একজন ব্যবসায়ী ভোটার বলেন, “এভাবে নিজেদের মধ্যে অস্থিরতা থাকলে বিএনপির জন্য মাঠের পরিস্থিতি কঠিন হবে। এখনই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করলে ক্ষতি হবে দলেরই।”

ভোটারদের মধ্যে অনেকেই দলীয় অনুগত থাকলেও তারা বলছেন, ভুল সিদ্ধান্ত, অনভিজ্ঞ প্রার্থী, মাঠপর্যায়ের মতামত উপেক্ষা ও কেন্দ্রের বাস্তবতা না বোঝা—এই চারটি কারণ পরিস্থিতির মূল উৎস। অনেক ভোটার এটিকে বিএনপির নির্বাচনি প্রস্তুতির জন্য ‘খারাপ সংকেত’ হিসেবে দেখছেন।

মনোনয়ন ঘিরে রাজশাহীর চার আসনে সৃষ্ট অস্থিরতা বিএনপির জন্য আগামী নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের জোরালো দাবি, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এ সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করুন। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট আসনগুলোয় দলটির নির্বাচনি অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত