১৮ ঘণ্টায়ও নিভল না হংকং কমপ্লেক্সের আগুন, নিহত ৪৪

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৮ বার
হংকংয়ের অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২৮

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হংকং-চায়নার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত একটি বৃহৎ হাউজিং কমপ্লেক্সে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ১৮ ঘণ্টা অতিক্রম করেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আটটি বহুতল ভবনের বিশাল কমপ্লেক্সটির মাত্র চারটির আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে পেরেছে। বাকি ব্লকগুলোতে এখনো দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে পুরো এলাকা। এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৪৪ জনে। পাশাপাশি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন কমপক্ষে ২৭৯ জন বাসিন্দা, যাদের সন্ধানে প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস।

হংকংয়ের গত আট দশকের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসা ৭শ’র বেশি ফায়ার ফাইটার টানা কাজ করলেও আগুনের তীব্রতা কমছে না। ধোঁয়ার মাত্রা এতটাই বেশি যে উদ্ধারকর্মীদের বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করেও ভেতরে বেশি সময় থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আগুন লাগার কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে স্থানীয় প্রশাসন। দুর্ঘটনার তদন্ত চলছে এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে—চলমান সংস্কার কাজের সময় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা কোনো বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

স্থানীয় সময় বিকেল তিনটার দিকে প্রথম আগুনের খবর পাওয়া যায়। ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পেয়ে একজন বাসিন্দা ফায়ার সার্ভিসে ফোন করেন। এরপর মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ব্লকে। আগুন নেভাতে গিয়ে একজন ফায়ার ফাইটার জীবন হারিয়েছেন, যাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করার কথা জানিয়েছে সরকার।

হাউজিং কমপ্লেক্সটির আটটি ব্লকে রয়েছে প্রায় দুই হাজার অ্যাপার্টমেন্ট। গত আদমশুমারি অনুযায়ী মোট বাসিন্দার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬০০ জন। তবে সংস্কার কাজ চলায় এখন ঠিক কতজন মানুষ ভবনগুলোর ভেতরে ছিল তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন। অনেকেই হয়তো সাময়িকভাবে বাইরে ছিলেন, আবার অনেকেই ভেতরেই আটকা পড়েছেন—ঠিক কতজন, তা বুঝতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চারপাশে নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য তৈরি করা বাঁশের মাচাগুলোকে দায়ী করা হচ্ছে। এই মাচাগুলো আগুনের সংস্পর্শে এলে কয়েক সেকেন্ডেই বড় আয়তনে জ্বলে উঠে এবং ব্লক থেকে ব্লকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছে। মাচার ধ্বংসাবশেষ ভেঙে পড়ে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন করে তুলেছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক আহতের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ায় অনেকের অবস্থা দ্রুতই গুরুতর হয়ে ওঠেছে। জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত ডাক্তার ও নার্স মোতায়েন করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেড সংকটে যাতে সমস্যায় না পড়তে হয়, সে জন্য নিকটস্থ আরও দুটি প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

এদিকে ঘটনাস্থলের আশপাশের ভবনগুলো থেকে বাসিন্দাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাছের একটি স্কুলে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে স্বজনহারাদের ভিড় লেগে আছে। নিখোঁজদের নাম নিবন্ধন এবং খোঁজ-খবর নিতে আলাদা হেল্প ডেস্ক খোলা হয়েছে। এলাকাজুড়ে চলছে নীরব আতঙ্ক, এক ধরনের চাপা শোকের পরিবেশ।

এই অগ্নিকাণ্ডকে ‘লেভেল ফাইভ’ ক্যাটাগরিতে ঘোষণা করেছে হংকং প্রশাসন, যা দুর্যোগের সর্বোচ্চ মাত্রা। এর অর্থ হচ্ছে, সব ধরনের জরুরি সেবা একসঙ্গে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে সামরিক বাহিনীর সহায়তাও নেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিরাপত্তা মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা করতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ বিশ্বনেতারা এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। চীন সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতার মধ্যেও স্থানীয় মানুষ একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধারকর্মীদের জন্য খাবার, পানি, ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করছেন। অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহ শুরু করেছেন। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সহায়তার প্রস্তুতি নিয়েছে।

রাতভর আগুন নেভানোর লড়াই চলছে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও সময় লাগবে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এখনও কেউ জীবিত আছে কিনা, সেই আশায় প্রতিটি কোণ তল্লাশি করা হচ্ছে। প্রতিটি উদ্ধারেই আছে বেদনার সঙ্গে একটুকু আশা।

হংকং-চায়নার এই অগ্নিকাণ্ড দেশটির ইতিহাসে উঠল আরেকটি শোকাবহ অধ্যায় হিসেবে। মানুষের প্রাণহানি, নিখোঁজদের দীর্ঘ তালিকা এবং বিশাল ক্ষয়ক্ষতি এই ঘটনার বেদনাকে আরও গভীর করেছে। এখন সবারই অপেক্ষা—আগুন নিভে যাক, নিখোঁজরা ফিরে আসুক, আর ভবিষ্যতে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা আর না ঘটুক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত