এমবাপ্পের চার গোলেও রিয়ালের জয় ঘাম ঝরানো

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৮ বার
এমবাপ্পের চার গোলেও রিয়ালের জয় ঘাম ঝরানো

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মহারণে কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত চার গোলও রিয়াল মাদ্রিদের জন্য আরামদায়ক জয় এনে দিতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত লড়াই হয়েছে, দুলেছে ম্যাচের উত্তেজনার সূচক, আর মাঠজুড়ে তৈরি হয়েছে প্রতিটি মুহূর্তে নতুন নাটকীয়তা। শেষ পর্যন্ত গ্রিসের কারাইসকাকিস স্টেডিয়ামে অলিম্পিয়াকোসকে ৪–৩ গোলে হারিয়ে নিজেদের জয়খরা অবসান ঘটিয়েছে জাবি আলোনসোর দল। তবু যে পরিমাণ ঘাম ঝরাতে হয়েছে, তা তাদের শিবিরে রেখে গেছে দুশ্চিন্তার ছাপ।

চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা তিন ম্যাচ জয়হীন থাকার চাপ নিয়ে এ ম্যাচে নেমেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। তাদের সামনে ছিল প্রতিপক্ষের মাঠের কঠিন পরীক্ষার বাস্তবতা। গ্রিসের দর্শকরা স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত, গ্যালারির প্রতিটি অংশ রঙিন পতাকায় ভরে উঠেছিল ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই। এভাবে রিয়ালের সামনে অপেক্ষা করছিল এক উত্তপ্ত পরিবেশ। আলোনসোর শিষ্যরা জানতেন, আত্মবিশ্বাস ফেরাতে জয়ের কোনো বিকল্প নেই।

ম্যাচের শুরু থেকেই রিয়ালের খেলায় দেখা যায় আক্রমণাত্মক মনোভাব। এমবাপ্পে, ভিনিসিউস, বেলিংহামরা ধারাবাহিকভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেদ করার চেষ্টা করতে থাকেন। তবে প্রথম গোলটি হলো সম্পূর্ণ ম্যাচের গতি উল্টে যাওয়ার মতোই। রিয়ালের প্রতি আক্রমণের ঝড় উপেক্ষা করে স্রোতের বিপরীতে গোল করে বসে অলিম্পিয়াকোস। চিকিনিয়োর নিখুঁত শটে এগিয়ে যায় গ্রিক জায়ান্টরা। রিয়ালের ডিফেন্ডাররা মুহূর্তিক ভুলে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় গোলটি অনেকটা সহজ হয়ে যায়।

গোলের পর মুহূর্তেই চাপে পড়ে রিয়াল, আর অলিম্পিয়াকোস গ্যালারিতে শুরু হয় উৎসবে মাতামাতি। রিয়ালের সামনে তখন একটি পথই খোলা—অবস্থা দ্রুত পাল্টে দেওয়া। ঠিক সেই জায়গাতেই উঠে আসে এমবাপ্পের নাম। ম্যাচের ২২তম মিনিটে বক্সে ঢুকে প্রথমবারের মতো বল জালে জড়ান ফরাসি তারকা। গোলটি এতটাই নিখুঁত ছিল যেন সেটি শুধু সমতা ফেরানোর গোল নয়, বরং ম্যাচের দিক ধরে রাখার টনিক।

এরপর মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে আরও দুইবার জালে বল পাঠান এমবাপ্পে। তার গতি, দক্ষতা ও শারীরিক সক্ষমতার কোনো উত্তরই খুঁজে পায়নি অলিম্পিয়াকোসের ডিফেন্ডাররা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এমবাপ্পের এই হ্যাটট্রিক হয়ে গেছে দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক। রিয়ালের সমর্থকদের উল্লাস তখন ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে। এত দ্রুত ম্যাচ ঘুরে দাঁড়ানোতে ফুটে ওঠে রিয়ালের মানসিক শক্তি, আর বিশেষ করে এমবাপ্পের ভয়ানক ধারালো ফর্ম।

তবে ম্যাচের গল্প এখানেই থেমে থাকেনি। দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই লড়াইয়ের মোড় ঘুরছে বুঝে যায় দুই দলই। অলিম্পিয়াকোস তখনও ম্যাচে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখছিল। ৫২তম মিনিটে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেন ইরানের ফরোয়ার্ড মেহদি তারেমি। বক্সের ভেতর থেকে তার নিখুঁত হেড রিয়ালের গোলকিপারকে পরাস্ত করে ব্যবধান কমিয়ে আনে। গোলের পর মুহূর্তেই স্টেডিয়ামের তাপমাত্রা যেন আরও কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যায়। রিয়াল হঠাৎ করে আবার চাপের মুখে পড়ে।

দ্বিতীয়ার্ধে রিয়ালের ডিফেন্স বেশ নড়বড়ে মনে হয়। আলোনসো মাঠে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্নভাবে নির্দেশনা দিতে থাকেন। খেলার তাল রিয়ালের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এমন ছবি তৈরি হচ্ছিল। এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আবার সামনে আসেন এমবাপ্পে। ৫৯তম মিনিটে তার চতুর্থ গোল পুরো ম্যাচকে এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গোলটি ছিল গোলস্কোরারের প্রবল আত্মবিশ্বাসের পরিচয়। বিধ্বংসী শটে বল জালে জড়ানোর পর এমবাপ্পের উদযাপন দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন একাই রিয়ালকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন এগিয়ে।

রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকেরা ভেবেছিলেন, চার গোলের ব্যবধানে তাদের দল এখন নিরাপদে। কিন্তু ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত সবকিছুই অনিশ্চিত। ম্যাচের শেষ দিকে অলিম্পিয়াকোস নতুন করে আক্রমণের ধারালতা বাড়ায়। একের পর এক আক্রমণে রিয়ালের রক্ষণের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠে। কয়েকবার তারা গোলমুখে বিপজ্জনক সুযোগও তৈরি করে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে রিয়ালের গোলরক্ষক এবং ডিফেন্ডাররা কোনোভাবে বল ঠেকিয়ে দেন। দর্শকরা তখন নিঃশ্বাস চেপে বসে ছিলেন; ম্যাচের শেষ মিনিটগুলোতে যে কোনো দিকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত রেফারির শেষ বাঁশি রিয়ালের স্বস্তি এনে দেয়। ৪–৩ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হলেও আলোনসোর কপালে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার রেখা ছিল। এমন মূল্যবান ম্যাচে চার গোল করেও দলের এমনভাবে ভুগতে হওয়া সত্যিই উদ্বেগের কারণ। রিয়ালের ডিফেন্স এবং মিডফিল্ডের সমন্বয় নিয়ে আরও কাজ করার প্রয়োজনীয়তা আবারও স্পষ্টভাবে চোখে আঘাত করে।

জয়ে পয়েন্ট টেবিলেও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। চার ম্যাচ শেষে তাদের পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ১২, যা তাদের পাঁচ নম্বর স্থানে নিয়ে গেছে। তবে এই অবস্থান যে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়, তা আলোনসো ভালো করেই জানেন। সমর্থকরাও বুঝতে পারছেন যে শুধুমাত্র এমবাপ্পের ওপর নির্ভর করে পুরো মৌসুম চালানো যাবে না। দলীয় সমন্বয়, বিশেষ করে রক্ষণভাগের শৃঙ্খলা উন্নত করা এখন সময়ের দাবি।

অন্যদিকে অলিম্পিয়াকোসের জন্য এটি আরেকটি হতাশার রাত। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এখনো জয়ের দেখা পায়নি গ্রিক দলটি। তাদের পয়েন্ট টেবিলের অবস্থানও আশানুরূপ নয়; টেবিলের ৩৩তম স্থানে থাকা দলটির সামনে এখন বাকি ম্যাচগুলোতে নতুন করে ভাবার সুযোগ আছে। তবে দলের প্রদর্শিত লড়াইয়ের মানসিকতা প্রশংসিত হয়েছে। তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রিয়ালকে চাপে রেখেছে, এবং ম্যাচটিকে আক্ষরিক অর্থেই দর্শকদের জন্য রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সবসময়ই নাটকীয়তার মঞ্চ। কিন্তু এই ম্যাচটি নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম রোমাঞ্চকর লড়াই হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একদিকে এমবাপ্পের অসাধারণ চার গোল, অন্যদিকে অলিম্পিয়াকোসের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই—সব মিলিয়ে ফুটবলপ্রেমীরা পেয়েছেন এক বর্ণিল সন্ধ্যা। রিয়ালের জন্য এটি স্রেফ একটি জয় নয়, বরং একটি সতর্কবার্তাও। সামনে বড় বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে, আর সেই পরীক্ষায় পাস করতে হলে দলকে আরও শক্তিশালী হতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত