প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনটি পৃথক মামলায় ২১ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন এই রায় ঘোষণা করেন। এই রায় ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ জনগণ একেবারে চাঞ্চল্যকান্ডে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এই মামলায় রায় ঘোষণার জন্য আদালত ২৩ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেছিলেন। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল) এবং ২২ জন পলাতক আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে তারা নিজেদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে পারেননি এবং আত্মপক্ষ শুনানিতে নিজেরা নির্দোষ দাবি করতে পারেননি। আদালতের এই রায় একদিকে যেমন জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
প্রথম মামলাটি দায়ের করা হয় গত ১৪ জানুয়ারি। শুরুতে এতে আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, পরে তদন্তে চার্জশিটে এই সংখ্যা বেড়ে ১২ জন হয়। মামলার আসামিদের মধ্যে ছিলেন পুরবী গোলদার, খুরশীদ আলম, নাসির উদ্দীন, মেজর (অব.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী, নায়েব আলী শরীফ, কাজী ওয়াছি উদ্দিন, শহিদ উল্লাহ খন্দকার এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ। এই মামলায় অভিযোগ ওঠে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি সম্পত্তি নিজের বা পরিবারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় মামলাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়সহ ১৭ জনকে চার্জশিটভুক্ত করা হয়। এই মামলার আসামিদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম সরকার, পুরবী গোলদার, কাজী ওয়াছি উদ্দিন, শহিদ উল্লাহ খন্দকার, আনিছুর রহমান মিঞা, নাসির উদ্দীন, মেজর (অব.) সামসুদ্দীন, নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ রয়েছেন। মামলায় অভিযোগ ওঠে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অযৌক্তিক ব্যবহার ও ভূমি বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
তৃতীয় মামলাটি ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত। এই মামলায় শেখ হাসিনা ও তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জাল রেকর্ডপত্র তৈরি করা, অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়া এবং সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এই মামলার অন্যান্য আসামিদের মধ্যে ছিলেন কবির আল আসাদ, তন্ময় দাস, নাসির উদ্দীন, মেজর (অব.) সামসুদ্দীন, হাফিজুর রহমান, হাবিবুর রহমান এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ।
এদিকে আদালত সূত্র জানায়, মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের সময় ৯১ জন সাক্ষীর বক্তব্য বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু পলাতক আসামিরা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাদের যুক্তিতর্ক ও আত্মপক্ষ শুনানির সুযোগ হয়নি। খুরশীদ আলম আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং নিজের নির্দোষিতা দাবি করেছেন। তার আইনজীবী মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, “আমার মক্কেল এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সুবিধা গ্রহণ করেননি। তিনি কোন পদোন্নতি বা বেনিফিটও পাননি। তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ মানসিক ও প্রমাণভিত্তিক নয়।”
দূর্নীতি দমন কমিশনের কৌঁসুলি খান মাইনুল হাসান বলেন, “প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় প্রমাণিতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে। আমরা যথাযথ দলিল-দস্তাবেজ এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করেছি। আশা করি, এই মামলায় যথাযথ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।”
রাজধানীর বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই রায় দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর প্রভাব ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিয়ন্ত্রণেও প্রতিফলিত হতে পারে। বিশেষ করে দেশের রাজনীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক গণমাধ্যমে এই মামলার ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত এই তিনটি মামলায় দায় ও সাজা নির্ধারণের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্ষমতার ব্যবহার ও সরকারি সম্পত্তির অনিয়ম নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় সঠিক রায় দেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভিন্ন মতামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আবার অনেকে মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় অবস্থানের কারণে এই রায় বিতর্কিত।
এভাবে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নিয়ে তিনটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে এটি আইন ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আগামী দিনগুলোতে এই রায় এবং মামলার প্রভাব রাজনৈতিক দলগুলো, ভোটার এবং সাধারণ মানুষের মনোভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করবে।