নিজের মতো অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছেন? বিপদ কিন্তু সামনেই

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৩ বার
নিজের মতো অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছেন? বিপদ কিন্তু সামনেই

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজকাল অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের জীবনের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, সামান্য ব্যথা—যে কোনও অসুখেই অনেকেই মনে করেন, অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে এই অভ্যাস যে ভয়ঙ্কর সমস্যা তৈরি করতে পারে, তা অনেকেরই জানা নেই। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নিজের মতো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ ব্যবহার করা এক ধরনের নীরব শত্রু, যা ধীরে ধীরে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়া এখন অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এর আগে যা সহজে ওষুধে সেরে যেত, আজ সেই সংক্রমণগুলোও চিকিৎসায় জটিলতা সৃষ্টি করছে। সংক্রমণগুলো শুধুমাত্র চিকিৎসা জটিলই করছে না, সময়, অর্থ এবং সামাজিক সম্পদও বড়ভাবে ব্যয় করছে। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি ছয়টি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের মধ্যে একটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধী। বিশেষ করে মূত্রনালি সংক্রমণ, শ্বাসনালী সংক্রমণ এবং ক্ষতের সংক্রমণ এই সমস্যার প্রধান ক্ষেত্র।

অ্যান্টিবায়োটিক মূলত ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু আমরা যখন এগুলো বারবার, বা ভুলভাবে খাই, তখন ব্যাকটেরিয়া নতুন কৌশল শিখে নেয়। ফলে ওষুধ আর তাদের মারতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের শীর্ষে রয়েছে। ভারতে প্রায় ৭০ শতাংশ রক্তের সংক্রমণ এবং ৭৮ শতাংশ ই.কোলাই সংক্রমণ সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

এর মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যান্টিবায়োটিক সহজে পাওয়া। অনেকেই সর্দি-কাশি-জ্বরের মতো ভাইরাসজনিত অসুখেও অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে ফেলেন, যা কোনোভাবে কার্যকর নয়। এর ফলে শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াও নষ্ট হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং প্রতিরোধী জীবাণু বৃদ্ধি পায়। আরেকটি গুরুতর ভুল হলো—অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স শেষ না করা। দুই দিনেই যদি অসুস্থতা কমে যায়, অনেকেই বাকি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। এতে জীবাণুর কিছু অংশ বেঁচে যায় এবং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে অন্য মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

যখন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করা কমিয়ে দেয়, তখন সাধারণ অসুখও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণ মূত্রনালীর সংক্রমণও হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন হতে পারে। সামান্য ক্ষত পচন থেকে সংক্রমণ জটিল রূপ নিতে পারে। শ্বাসনালীর সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা মানুষদের জন্য সংক্রমণ প্রাণঘাতীও হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এমন অবস্থায় ভবিষ্যতে ছোট অপারেশন, দাঁতের চিকিৎসা, এমনকি প্রসবও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে, কারণ প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক তখন আর কার্যকর নাও হতে পারে।

তবে এই বিপদ মোকাবেলা সম্ভব। ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা, অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স শেষ করা এবং অযথা ওষুধ ব্যবহার না করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া কিছু সহজ স্বাস্থ্যবিধি যেমন—নিয়মিত হাত ধোয়া, খাবার ও বাসন পরিষ্কার রাখা, নিরাপদ খাবার প্রস্তুত, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা—এই সবকিছু সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক সংক্রমণই টিকা দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব, তাই সময়মতো টিকা নেওয়াও অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের জীবন বাঁচাতে পারে, কিন্তু ভুল হাতে পড়লে সেটাই বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিজে সচেতন না হলে শুধু নিজের জীবন নয়, পরিবারের এবং সম্প্রদায়ের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই নিজের, পরিবার ও সমাজকে নিরাপদ রাখতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সচেতনতা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং অ্যান্টিবায়োটিককে শুধুমাত্র প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এই সচেতনতা জরুরি। যেমন—ছোট অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে। এছাড়া শ্বাসনালীর সংক্রমণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ক্ষতের সংক্রমণ যেমন রকম জটিল হয়ে উঠছে, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রভাব কমানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বৃদ্ধি এখন শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নয়, পুরো বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য সংকটের কারণ হয়ে উঠছে। তাই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ে সচেতন হওয়া, চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলা, এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্ব নেওয়া এখন সময়ের অন্যতম জরুরি বিষয়। এটি শুধু স্বাস্থ্য রক্ষা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সংক্ষেপে বলা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক একটি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, কিন্তু তার যথাযথ ব্যবহার না হলে সেটি হতে পারে ধ্বংসাত্মক। নিজের মতো খাওয়া, কোর্স না শেষ করা, অযথা ব্যবহার—এই অভ্যাসগুলো আমাদের ও আমাদের সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই এখনই সচেতন হওয়া, পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সবচেয়ে বড় কর্তব্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত