সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দ্বন্দ্ব তুঙ্গে, তৃণমূল নেতাদের অস্থিরতা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
সিলেট-৩ মনোনয়ন দ্বন্দ্ব তুঙ্গে, তৃণমূল নেতাদের অস্থিরতা

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রসঙ্গে দলের তৃণমূল ও প্রবাসী নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দলের মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় থাকা নেতারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কেন্দ্র থেকে পাঠানো প্রতিনিধি এবং সরাসরি ফোনের মাধ্যমে তীব্র নির্দেশনা দিলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রার্থী এমএ মালিক মনোনয়ন পাওয়ার পরও অব্যাহত অস্থিরতা যেন দলের ভেতরে উত্তাপ সৃষ্টি করেছে।

এমএ মালিক, যিনি যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা, মনোনয়ন পাওয়ার পর তৃণমূলের বঞ্চিত নেতারা এখন প্রার্থী রিভিউর দাবি থেকে সরে আসতে নারাজ। এই অবস্থায় মনোনয়নপ্রাপ্ত মালিক নিজে কিছু মন্তব্য না করে দলীয় প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছেন। তবে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও প্রবাসী ব্যারিস্টার এমএ সালাম সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, ‘দল মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকরা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পদ-পদবি কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এটা সরাসরি দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রতি চ্যালেঞ্জ। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জেল খেটেছে বা মামলার শিকার হয়েছেন। এখন তারা নিজেদের দলের ভেতর থেকেই হুমকির মুখে পড়েছেন।’ সালামের এই মন্তব্য দলের ভেতরের অস্থিরতার মাত্রা আরও প্রমাণ করছে।

মাঠ পর্যায়ের নেতারা যুগান্তরকে বলেন, মনোনয়ন বিতর্কের মূল কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় থাকা নেতাদের বাদ দিয়ে প্রবাসী নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া। ১৯ বছর দেশে না আসা এমএ মালিককে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। এছাড়া, ব্যারিস্টার সালামও প্রবাসী হওয়ায় তারা তৃণমূলের মধ্যে আরও বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছেন। জেলার অভিজ্ঞ নেতারা মনে করছেন, এমন প্রেক্ষাপটে প্রার্থীর বিজয় এবং ভোট সংগঠনের জন্য তৃণমূলের সমর্থন অপরিহার্য, তাই তাদের প্রতিক্রিয়াকে নজরদারি ও সমাধান করার তাগিদ আরও জোরদার হচ্ছে।

এদিকে এমএ মালিকের অনুসারীরা বলছেন, তিনি দেশে না থাকলেও বিদেশ থেকে অবিরাম বিএনপির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। দলীয় কার্যক্রমে অবদান রেখেছেন এমন প্রবাসী নেতা হিসেবে তার মনোনয়ন যথাযথ। অন্যদিকে ব্যারিস্টার সালামের অনুসারীদের দাবি, তিনি এলাকায় শিক্ষা, ক্রীড়া এবং সমাজসেবায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছেন, যা তৃণমূলের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে।

সিলেট-৩ আসনে মোট পাঁচজন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এমএ মালিক মনোনয়ন পান, তবে বঞ্চিত হয়েছেন ব্যারিস্টার এমএ সালাম, জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল এবং নগর বিএনপির সহসভাপতি ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদনান। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই তৃণমূলে প্রার্থী রিভিউ ও সমন্বয় চাওয়া হয়েছে। প্রার্থী ঘোষণার পরই আব্দুল আহাদ খান জামালসহ কিছু নেতা মালিকের সঙ্গে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, তবে আব্দুস সালাম ও আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী এখনও মাঠে সক্রিয়।

মনোনয়নপ্রাপ্ত এমএ মালিক সম্প্রতি দক্ষিণ সুরমায় বিশাল শোডাউন করেন, যা দলীয় তৃণমূলের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কাইয়ুম চৌধুরী ও সালামের অনুসারীরা দাবি করেছেন, মালিক তার নিজ আসনের লোকদের ছাড়াই অন্য আসনের ভাড়াটে সমর্থক নিয়ে শোডাউন করছেন। এটি তৃণমূল নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের নতুন সূত্র তৈরি করেছে।

বিভিন্ন নেতারা বলছেন, কেন্দ্রের মনোনয়নের অধিকার থাকলেও ভোট এবং বিজয়ের জন্য মাঠের নেতাকর্মীদের সমর্থন অপরিহার্য। তাই তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের সন্তুষ্টির পথেই হাঁটা দলীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল নেতাদের হুমকি বা অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দলের ভোট সংগঠনে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

সিলেট-৩ এর এই মনোনয়ন বিতর্ক প্রমাণ করছে, প্রবাসী ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব কেবল মনোনয়নের বিষয় নয়, বরং দলের ভেতরের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং তৃণমূলের ক্ষমতার ভারসাম্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দীর্ঘদিন ধরে জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক ত্যাগ, মামলা ও নির্যাতন সহ্য করা নেতারা এখন তাদের অবদানের সঠিক স্বীকৃতি চাচ্ছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই অস্থিরতা মেনে নিতে পারছে না, তবে মাঠের তৃণমূলের অসন্তোষ এবং প্রার্থী রিভিউর দাবি তীব্র হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রের মনোনয়ন দেওয়ার অধিকার থাকলেও নির্বাচনী মাঠে সফল হওয়ার জন্য তৃণমূলের সমর্থন অর্জন অপরিহার্য। প্রার্থীর কার্যক্রম, নেতৃত্ব এবং সমর্থন নিশ্চিত করতে হলে দলের স্থানীয় ও প্রাদেশিক নেতাদের সাথে সমন্বয় বজায় রাখা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। নেতাদের এই দ্বন্দ্ব সামাল না দিলে আসন জয়ের সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সিলেট-৩ আসনের এই মনোনয়ন বিতর্কের প্রেক্ষাপটে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। প্রবাসী ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে সমন্বয়, তৃণমূলের স্বীকৃতি এবং দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা আগামী নির্বাচনী প্রস্তুতিতে এক বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত