যুক্তরাষ্ট্রে নীতির কড়াকড়ি, আরও ৩৯ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হলো

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৭ বার
যুক্তরাষ্ট্রে নীতির কড়াকড়ি, আরও ৩৯ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হলো

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতির কড়াকড়ি আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার ভোরে বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন আরও ৩৯ বাংলাদেশি নাগরিক। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার মধ্য দিয়ে তাদের দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর দায়িত্ব নেয় ব্র্যাক। সংস্থাটি তাদের তাৎক্ষণিক সহায়তা, প্রয়োজনীয় খাদ্য, কাউন্সেলিং এবং নিজ নিজ জেলায় ফেরার পরিবহণের ব্যবস্থা করে।

ফেরত আসা এই ৩৯ জনের বেশির ভাগই নোয়াখালীর বাসিন্দা। মোট ২৬ জনের বাড়ি ওই জেলায়। এ ছাড়া কুমিল্লা, সিলেট, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর থেকে দুজন করে এবং চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে একজন করে এসেছেন। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির মোট সংখ্যা দাঁড়াল ১৮৭ জনে। যদিও ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ সংখ্যা আরও বেশি—২২০–এরও বেশি বাংলাদেশিকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ফেরত পাঠিয়েছে। এই প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থায় অবৈধ প্রবেশ বা বৈধতার অভাবে অবস্থান désormais আর আগের মতো সহজ নেই।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ৩৯ জনের মধ্যে ৩৪ জনই বাংলাদেশ সরকারের বৈধ ছাড়পত্র নিয়ে ব্রাজিলে কর্মী হিসেবে গিয়েছিলেন। ব্রাজিল যাওয়ার পর তারা সেখানে কাজ না পেয়ে কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কম দেখে বিভিন্ন দালালের সহায়তায় মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছান। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেন অবৈধভাবে। মেক্সিকো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অনেকের জন্যই পথটি হয় ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। মরুভূমির উত্তাপ, সীমান্তরক্ষীদের কঠোরতা, দালালের প্রতারণা—সব মিলিয়ে যাত্রাটি হয়ে ওঠে অনিশ্চিত ও জীবনহানিকর। যদিও ফিরতি ফ্লাইটে আসা কেউই এসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি, তবে তাদের মুখের ক্লান্তি ও হতাশায় বোঝা যাচ্ছিল কঠিন সময়ের স্মৃতি এখনও তাজা।

ফেরত পাঠানোদের মধ্যে বাকি পাঁচজনের যাত্রাপথ আরও জটিল ছিল। দুজন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন ভিন্ন উদ্দেশ্যে এবং পরে অবৈধ অবস্থানের কারণে আটক হন। অপর তিনজন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিভিন্ন দালাল চক্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান, যেখানে প্রতারণা ও বিপদের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর তারা ‘অ্যাসাইলাম’ বা মানবিক কারণে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আইনি জটিলতা ও প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাবে আদালত তাদের আবেদন নাকচ করে দেয়। শেষে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান অভিবাসন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ব্রাজিলে কর্মী প্রেরণের অনুমতি যখন সরকার দিয়েছিল, তখন এজেন্সিগুলো কি নিশ্চিত হয়েছিল যে তারা সত্যি কর্মস্থলে যাচ্ছেন, নাকি কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পথ হিসেবে ব্রাজিলকে ব্যবহার করছেন? যারা ৩০–৩৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন এবং এখন শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের এই ক্ষতির দায় কার? তার মতে, যারা বিদেশগামীদের পাঠিয়েছেন এবং যারা প্রক্রিয়ার অনুমোদনে যুক্ত ছিলেন তাদের আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর। বিশেষ করে, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশসহ বহু দেশের অভিবাসীকে আটকের পর দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। পূর্বে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যেভাবে অনেককে শিকল পরিয়ে আনা হতো, এবার অন্তত সেই দৃশ্য দেখা যায়নি। বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, এবার তাদের স্বাভাবিকভাবেই দেশে পাঠানো হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল তুলনামূলক সহজ।

চলতি বছরের ৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র আরও ৪২ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠায়। মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যে ফেরত পাঠানো হয় অন্তত ৩৪ জনকে। এই বাড়তি প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের ফলে এবার প্রায় নিয়মিত বিরতিতেই চার্টার্ড বা সামরিক ফ্লাইটে ফেরত আসা নাগরিকদের সংখ্যা বাড়ছে। মার্কিন আইনে স্পষ্ট বলা আছে, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করলে আদালতের রায় বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যেকোনো অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়। বিশেষ করে আশ্রয় আবেদন বা ‘অ্যাসাইলাম ক্লেইম’ বাতিল হলে আইসিই খুব দ্রুত প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করে।

ফেরত আসা বাংলাদেশিদের অনেকেই দেশে ফিরে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। একদিকে রয়েছে পরিবারের চাপ, অন্যদিকে বিদেশযাত্রায় খরচ করা লাখ লাখ টাকার ঋণ। অনেকেই আবার কাজে ফিরে যাওয়ার নতুন পথ খোঁজেন, কেউ কেউ শঙ্কায় থাকেন দালাল চক্রের পুনরায় প্রলোভন দেখানো নিয়ে। এ কারণেই এখন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিবাসন খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, ব্রাজিলসহ ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নীতি প্রণয়ন এবং শ্রমবাজার যাচাই করে বৈধ অভিবাসন সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতির কঠোরতার কারণে ভবিষ্যতে ফেরত আসা বাংলাদেশির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে অভিবাসন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তবে যারা ফিরলেন, তারা এখন নতুন করে জীবন শুরু করতে প্রস্তুত কি না—এটাই বড় প্রশ্ন। সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়া, অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দেওয়া এবং বিদেশযাত্রার মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠা—প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন সহায়তা ও সচেতনতা।

বাংলাদেশের অভিবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে অনিয়ম, দালাল চক্রের প্রতারণা, বৈধতার অভাব এবং সংকটের মুহূর্তে সাহায্য না পাওয়ার অভিযোগের সংখ্যাও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্র ফেরত আসা এই ৩৯ জনের ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিল, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, যাতে কেউ নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টায় সব হারিয়ে শূন্য হাতে ফিরতে না হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত