প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে গত কয়েক মাস ধরেই তুমুল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, জোরপূর্বক গুম, খুন ও নির্যাতনের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হওয়ার পর থেকে মামলাটি নিয়ে চলমান বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বুধবার ট্রাইব্যুনালের তলবে হাজির হন আইনজীবী জেড আই খান পান্না, যিনি নিজেই শেখ হাসিনার পক্ষে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন; পরে আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়ে দেন যে তিনি ট্রাইব্যুনালে আর উপস্থিত হবেন না। তার এই অবস্থান পরিবর্তন এবং আদালতে অনুপস্থিতি বিচারপতিদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাই তাকে সরাসরি আদালত প্রশ্ন করেন—“তাহলে কি আমরা ধরে নেব আসামি শেখ হাসিনার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ রয়েছে?”
ট্রাইব্যুনালের এই প্রশ্নের পেছনে ছিল পান্নারই পূর্ববর্তী বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, যে আদালতে আসামির আস্থা নেই, সেখানে একজন আইনজীবী নৈতিকভাবে তার পক্ষে দাঁড়াতে পারেন না। আদালত বুধবার তাকে এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে বললে তার নীরবতা ও দ্বিধা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরক্ষণেই জেড আই খান পান্না দাঁড়িয়ে আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন, এবং জানান যে তার অবস্থান নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় তিনি দুঃখিত।
ঘটনার সূত্রপাত ২৩ নভেম্বর। সেদিন সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে শেখ হাসিনার পক্ষে লড়াইয়ের আবেদন করেন জেড আই পান্না। তার বক্তব্য ছিল—যেহেতু মামলা অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ, তাই একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে নিয়োগ পাওয়া স্টেট ডিফেন্স কাউন্সেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ তার আবেদন মঞ্জুর করে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে নিয়োগ দেন।
কিন্তু মাত্র চার দিন পর, ২৭ নভেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে সবাইকে অবাক করেন তিনি। স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রতি আস্থা নেই। আর যেখানে আসামি নিজেই এ আদালতের ওপর আস্থা হারিয়েছেন, সেখানে তার পক্ষে লড়াই করা নৈতিকভাবে সম্ভব নয়। তিনি শব্দচয়নেও স্পষ্ট করে দেন যে তিনি এ দায়িত্ব ছাড়ছেন। তার ভাষায়, “যে আদালতের প্রতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আস্থা নেই, সে আদালতে তাকে ডিফেন্ড করা উচিত না, অনৈতিক।”
এই ঘোষণার পরপরই আদালত তার অবস্থান ব্যাখ্যা চেয়ে তাকে তলব করে। বুধবার আদালতে হাজির হয়ে জেড আই পান্না জানান, তার উদ্দেশ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আদালতের প্রতি অনাস্থা নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে তার বক্তব্য ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা তিনি নিজেও পরে উপলব্ধি করেছেন। আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “আমার বক্তব্য ভুলভাবে মানুষ নিয়েছে। আমি আদালতের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করি। যদি কোনো বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকে, আমি তার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি।”
আদালতের কাছে এ ক্ষমাপ্রার্থনা সত্ত্বেও বিচারপতিদের প্রশ্ন ছিল আরও গভীর। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন যে একজন আইনজীবীর পক্ষ থেকে এমন দ্বৈত অবস্থান শুধু বিচার প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন ছিল—পান্নার এই আচরণের আড়ালে কোনো বিশেষ যোগাযোগ বা প্রভাব কি কাজ করেছে? বিচারপতির ভাষায়, “আপনি যেহেতু বলেছেন আসামির আস্থা নেই, এবং আপনি আদালতে আসেননি, তাহলে কি আমরা ধরে নেব আপনি আসামি শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন?”
এই প্রশ্নে আদালতের পরিবেশ আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে। জেড আই পান্না তাৎক্ষণিকভাবে জানান, তার শেখ হাসিনার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই এবং তিনি কেবল সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ব্যক্তিগত দ্বিধার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি শুধুমাত্র পেশাগত নীতির জায়গা থেকেই বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। এরপর আদালত তার ক্ষমাপ্রার্থনা নথিভুক্ত করে তাকে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য সময় দেয়।
মামলাটি বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার ও বিচারের পর থেকেই দেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক নিখোঁজ, হত্যা, নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ; যা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলেও বিতর্কিত বিষয়। তার সমর্থকরা মনে করেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা; অন্যদিকে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করে, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের বিচার হচ্ছে এখন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের সাবেক প্রধানের এ ধরনের মামলায় প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। একজন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীর দায়িত্ব আরও স্পর্শকাতর, কারণ তিনি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসামির অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত। তিনি অযৌক্তিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই পান্নার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া স্ট্যাটাস, পরে তার অনুপস্থিতি, এবং পুনরায় আদালতে উপস্থিত হওয়া—সবকিছুই পরিস্থিতিকে আরও নাটকীয় করে তুলেছে।
ট্রাইব্যুনাল এ ঘটনায় যে ধরনের কঠোর ভাষায় প্রশ্ন তুলেছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে তারা কোনোভাবেই মামলার স্বচ্ছতা ও বিচারিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে চাইছে না। অপরদিকে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটাই প্রশ্ন—শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলাটি কতটা নিরপেক্ষভাবে বিচার হবে, এবং এ মামলার মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
জেড আই খান পান্নার ক্ষমাপ্রার্থনার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলেও মামলার জটিলতা, রাজনৈতিক অভিঘাত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার পথচলায় নতুন প্রশ্ন যোগ হলো আরও একটি—আইনজীবীর অবস্থান পরিবর্তনের এই নাটক কি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর রাজনৈতিক ছায়া?