প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাদারীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খানের নামে মামলা দায়ের করেছে। অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা এবং জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জন। বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) দুদক প্রধান কার্যালয়ে নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন। মামলাটি দায়ের করেন কমিশনের সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঐশী খানের নামে ১ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৭৫০ টাকার সম্পদ এবং ১১ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৪ টাকার পারিবারিক ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। মোট ১ কোটি ৮১ লাখ ৭১ হাজার ৯০৪ টাকার সম্পদের বিপরীতে তার বৈধ আয় মাত্র ১০ লাখ ৫৩ হাজার ৮৯২ টাকা। এর অর্থ ১ কোটি ৭১ লাখ ১৮ হাজার ৯২ টাকার জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদের তথ্য দুদকের কাছে পাওয়া গেছে। এছাড়া তার নামে বা বেনামে আরও সম্পদ থাকার সম্ভাবনা অনুসন্ধান টিমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কমিশন ঐশী খানকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দিয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়েও নোটিশ প্রদান সম্ভব হয়নি। তাই ২০২৫ সালের ১০ জুলাই সম্পদ বিবরণী ফরম লটকিয়ে জারি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি এক মাস সময় বৃদ্ধির আবেদন করলে ২১ কার্যদিবসের সঙ্গে আরও ১৫ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়। তবে বাড়তি সময় পেলেও তিনি সম্পদ বিবরণী দাখিল করেননি।
দুদক বলেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া তার নামে বিপুল অপ্রদর্শিত ও জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ায় ২৭(১) ধারার অভিযোগও প্রযোজ্য বলে কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দুদক এখন আদালতের মাধ্যমে এই মামলা তদারকি করবে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমরা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ন্যায্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগ যাচাই করেছি। দেশের জনগণকে দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ সরকারি কর্মকর্তাদের অধীনে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে নয়, বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। তারা বলছেন, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিষয়ে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত তথ্য প্রদান গুরুত্বপূর্ণ। যদি তা না করা হয়, তাহলে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এই মামলার প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় যে, দেশে রাজনৈতিক পরিবারের উচ্চপর্যায়ের সদস্যদের সম্পদের উৎস এবং বৈধতা যাচাই করা হচ্ছে। এটি শুধু দুর্নীতি দমন নয়, বরং প্রশাসনিক ও সামাজিক স্বচ্ছতার প্রতিফলনও। মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান ও প্রমাণ সংগ্রহের পরে দায়ের করা হয়েছে।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, “আমরা নিয়মিত অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাই করি। কেউ যদি নির্ধারিত সময়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করে বা বৈধ উৎস ছাড়া বিপুল সম্পদ অর্জন করে, আমরা আইনের আওতায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই।”
এই মামলা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি জনগণের কাছে আইনপ্রণেতাদের দায়িত্বশীলতা ও দায়িত্ব পালনের মান নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত নথি, হিসাব ও প্রমাণাদি আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হবে। কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, “আমরা ন্যায়পরায়ণ প্রক্রিয়া মেনে সম্পূর্ণ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চালাব।”
শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খান বর্তমানে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। তবে তার সম্পদের উৎস ও বৈধতা যাচাই না হওয়ায় দুদক এই মামলা দায়ের করেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলা আইন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।
মামলার প্রসঙ্গে বলা যায়, এটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের জন্য সতর্কতা হিসেবে কাজ করবে। যারা সম্পদ বিবরণী দাখিলের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকে, তাদের বিরুদ্ধে দুদক কঠোর পদক্ষেপ নেবে। এটি দেশব্যাপী স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার জন্য একটি মাইলফলক।