গুমের অভিযোগে নির্দেশ–বাস্তবায়নের শৃঙ্খল উন্মোচন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
গুমের অভিযোগে নির্দেশ–বাস্তবায়নের শৃঙ্খল উন্মোচন

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেগুলোর অনেকটাই নতুন করে সামনে এলো চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্যে। রোববার দুপুরে দেওয়া এক মন্তব্যে তিনি বলেন, কথিত গুমের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশ দিতেন এবং সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন তারিক আহমেদ সিদ্দিক। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় তোলে। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

গুম বা জোরপূর্বক গায়েব করা—এই শব্দটি বাংলাদেশে নতুন নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার অভিযোগ করে আসছিল, রাজনৈতিক বিরোধী, ভিন্নমতাবলম্বী কিংবা রহস্যজনকভাবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকছেন। কারও খোঁজ আর কখনোই পাওয়া যায়নি, আবার কেউ কেউ মাস বা বছর পর ফিরে এসে অজানা স্থানে বন্দি থাকার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি পর্যায়ে স্পষ্ট কোনো স্বীকারোক্তি বা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের তথ্য জনসম্মুখে তেমনভাবে আসেনি।

চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যে প্রথমবারের মতো একটি সুস্পষ্ট ‘কমান্ড চেইন’ বা নির্দেশনামূলক কাঠামোর কথা এসেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুমের নির্দেশ দিতেন শেখ হাসিনা এবং বাস্তবায়নের তদারকি ও অপারেশনাল দায়িত্ব পালন করতেন তারিক আহমেদ সিদ্দিক। যদিও এই অভিযোগগুলোর আইনি প্রমাণ, নথি বা বিচারিক পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক উপস্থাপন এখনো পুরোপুরি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, তবুও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই দেশ-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

সবচেয়ে নাড়া দেওয়া দিকটি হলো ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে আচরণের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ। মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম দাবি করেন, যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, কখনো ভয় দেখানো হয়েছে, আবার কখনো ‘সমঝোতার’ নামে ডেকে নেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, গণভবনে ডেকে এনে পরিস্থিতি আড়াল করার জন্য “নাটক” সাজানো হতো। যদিও গণভবন বা সংশ্লিষ্ট মহল থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে এই বক্তব্যগুলো নতুন করে সেই সময়ের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর স্মৃতিকে সামনে এনে দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে অনেক পরিবার নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে শুরু করেছে। কেউ লিখেছেন, “বছরের পর বছর ধরে আমরা সত্য জানার অপেক্ষায় ছিলাম।” কেউ আবার জানিয়েছেন, একজন বাবা বা স্বামীর হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার পর কীভাবে পুরো পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। এসব ব্যক্তিগত কাহিনি শুধুই রাজনৈতিক বিতর্কের নয়, বরং একটি গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহু আগে থেকেই বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নথিভুক্ত করে আসছে। জাতিসংঘের কয়েকটি বিশেষ র‍্যাপোর্টেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এমন ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বারবার স্বচ্ছ, স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে তদন্তের আহ্বান এসেছে। চিফ প্রসিকিউটরের এই বক্তব্য সেই পুরনো দাবিগুলোকে আবার নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

তবে এই বিষয়টি কেবল রাজনীতির ইস্যু হিসেবে না দেখে অনেকেই একে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন। আইনজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণের জন্য শক্ত প্রামাণ্য দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং স্বাধীন তদন্ত অপরিহার্য। মৌখিক বক্তব্য বা রাজনৈতিক ভাষণের ভিত্তিতে নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সত্য উদ্ঘাটনের পথে এগোতে হবে। না হলে এ ধরনের বক্তব্য নতুন করে বিভাজন ও উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকে যায়—নিখোঁজ মানুষগুলোর ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছিল? অনেক পরিবার এখনো দিনের পর দিন থানায়, বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ঘুরে স্বজনদের খোঁজ করেছে। কেউ কোনো উত্তর পায়নি, কেউ আবার ভয় পেয়ে মুখ বন্ধ করে রেখেছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই নীরব যন্ত্রণাগুলোই হয়তো এই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু।

সরকারি পর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি। তবে দেশের নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছে, অতীতের এসব অভিযোগকে উপেক্ষা করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। সত্য ও ন্যায়ের পথেই টেকসই স্থিতিশীলতা আসতে পারে—এমন ধারণা এখন সামাজিক পরিসরে শক্ত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, গুম সংক্রান্ত অভিযোগে শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা ও বাস্তবায়নের কাঠামোর কথা উঠে আসা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই মুহূর্ত দায়িত্ব ও নিরপেক্ষতারও এক কঠিন পরীক্ষা। কারণ, এখানে শুধু রাজনীতির প্রশ্ন নয়—এখানে প্রশ্ন মানুষের জীবন, নিখোঁজ মানুষের পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস আর একটি জাতির বিবেকের। ভবিষ্যৎই বলে দেবে, এই অভিযোগ কতটা স্বচ্ছভাবে তদন্ত হয়, কতটা সত্য উদ্ঘাটিত হয় এবং কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত