ট্রাইব্যুনালে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিতে হাজির হাসনাত আব্দুল্লাহ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
আবু সাঈদ হত্যা ট্রাইব্যুনাল

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বহুল আলোচিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আজ আবারও নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ দিনে উপনীত হলো বিচারপ্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। মঙ্গলবার সকালে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এ উপস্থিত হন এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জবানবন্দি দেওয়ার প্রস্তুতি নেন। তার সাক্ষ্যকে মামলার অগ্রগতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাষ্ট্রপক্ষ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আজকের শুনানিটি পরিচালনা করছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বিচারকদের এই প্যানেল অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যা-নির্যাতন সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার করেছেন। ফলে আজকের শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতে যেমন উত্তেজনা ও গুরুত্ব বিদ্যমান, তেমনি একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের জন্য নতুন আশার আলোও দেখা দিয়েছে।

আবু সাঈদ ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক উদ্যমী, মানবিক এবং শিক্ষাবান্ধব ছাত্র। জুলাই বিপ্লবের সময় ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া সহিংসতার প্রথম শহীদ হিসেবে তার নাম উচ্চারিত হয়। তার মৃত্যু শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোক নেমে এসেছিল, দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ঘটনাটির সত্য উদ্ঘাটন ও বিচার দাবি করে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও অনলাইন প্রচারণা চালিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

মামলার চার্জশিট অনুযায়ী মোট ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন। এ ছয়জনের বিরুদ্ধে ঘটনার দিন বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে আছেন এএসআই আমির হোসেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল এবং আনোয়ার পারভেজ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য থেকেও আলোচনায় এসেছে যে ঘটনার পেছনে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা থাকতে পারে এবং সেই পরিকল্পনার বিভিন্ন স্তরে যুক্ত ছিল একাধিক ব্যক্তি।

রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, মামলার জটিলতা এবং শিকড়হীন গুজবের বনানীর মাঝেও সাক্ষ্য-প্রমাণগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম, এবং প্রত্যেকটি সাক্ষ্যই বিচার প্রক্রিয়ার গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রথমদিকে সাক্ষীদের অনেকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে সামনে আসতে দ্বিধায় ছিলেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর সাক্ষীরা একে একে এগিয়ে আসছেন। আজকের শুনানিতে হাজির হওয়া এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ছিলেন ঘটনাটির সময়ে দক্ষিণাঞ্চলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের একজন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, ঘটনাটি সম্পর্কে তার দেওয়া তথ্য ও বিবরণ মামলার গতিপথকে আরও স্পষ্ট করবে।

ট্রাইব্যুনাল চত্বরের পরিবেশ ছিল সকাল থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ। আবু সাঈদের পরিবার, ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী, মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন শুনানির তথ্য সংগ্রহে। ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন ব্যানারে বহন করা স্লোগান–“আবু সাঈদের রক্ত বৃথা যাবে না”—আজও প্রতিধ্বনিত হয় আদালত চত্বরে। পরিবারের সদস্যরা বলেন, তাদের জন্য প্রতিদিনই একটি কঠিন দিন, কিন্তু আজকের শুনানি তাদের কাছে ‘সত্যের পথে আরেক ধাপ অগ্রযাত্রা’।

আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদের মা বলেন, “আজ আমার ছেলে বিচার পাবে সেই আশায় এখানে দাঁড়িয়ে আছি। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই।” তার কণ্ঠে ছিল বেদনার সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রামের ক্লান্তি, তবে ছিল অবিচল প্রত্যয়ও।

অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বরাবরের মতোই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অনেককে ভুলভাবে আসামি করা হয়েছে। তারা আদালতের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি জানান। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীরা মনে করেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ দৃঢ় এবং এ মামলার রায় দেশের বিচারব্যবস্থায় নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করবে।

প্রসঙ্গত, এর আগে মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নিরাপত্তা কর্মী এবং প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। প্রত্যেকে ঘটনাটির ভয়াবহতা ও পরিকল্পিত দিক সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করেছেন। তদন্তকারীরা বলছেন, আবু সাঈদ হত্যার উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র আন্দোলনকে দমন করা এবং ভয় সৃষ্টি করা, যাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্থবির হয়ে পড়ে।

আজকের শুনানির প্রতি রাজনৈতিক মহলও দৃষ্টি রাখছে। কারণ ওই সময়কার সহিংসতা ক্যাম্পাস রাজনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পুলিশি ভূমিকা এবং ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছিল। আজকের সাক্ষ্য এসব আলোচনাকে নতুন দিকে নিতে পারে। বিশেষ করে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের এই নেতার সাক্ষ্য ঘটনাটির ভেতরের পরিকল্পনা, তৎকালীন পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা সম্পর্কে আদালতকে অনেক তথ্য দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, আবু সাঈদ হত্যার বিচার কেবল এক ব্যক্তির জন্য ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতিরও একটি স্পর্শকাতর পরীক্ষা। আজকের শুনানি সেই পরীক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত