বিদেশি আইনজীবী চাইলেও অনুমতি মেলেনি আনিসুল-সালমানের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
মানবতাবিরোধী মামলায় বিদেশি আইনজীবী চাইলেও অনুমতি মেলেনি

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার উসকানির অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আইনি লড়াইয়ে বিদেশি আইনজীবীর সহায়তা নিতে চান। তাদের পক্ষে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানালেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আবেদন গ্রহণ করেনি। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মামলার অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার সুযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বুধবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে আবেদন উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। তিনি যুক্তি দেন, মামলাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের জটিল প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এতে আন্তর্জাতিক আইনি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। যেহেতু অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিসরে আসে, তাই বিদেশি আইনজীবী যুক্ত হলে প্রতিরক্ষা আরও পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে ট্রাইব্যুনাল আবেদনটি নাকচ করে জানায়, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার অভ্যন্তরীণ আইনের আওতাভুক্ত, এবং এ ধরনের বিচারে স্থানীয় আইনজীবীদের পক্ষে সব ধরনের আইনি সহায়তা ও দক্ষতা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আরও বলে, বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের অনুমতি দিলে বিচার প্রক্রিয়ার গতি ও নিরাপত্তা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। ফলে ট্রাইব্যুনাল মনে করে বর্তমান ব্যবস্থাই যথেষ্ট এবং বিদেশি আইনজীবীর প্রয়োজন নেই।

এর আগে, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানির জন্য সময় চান। তিনি বলেন, মামলার নথিপত্র এবং জড়িত সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণে আরও কিছু সময় প্রয়োজন। আদালত উভয় পক্ষের আবেদন বিবেচনা করে আগামী ১৭ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠন বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।

জুলাই আন্দোলন ঘিরে যে সহিংসতার বিস্তার ঘটে এবং তাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে, তা দেশ-বিদেশে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও অস্থিরতার অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে আসে। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ করছে, আন্দোলন চলাকালে পরিকল্পিতভাবে ছাত্র-জনতাকে হামলায় উসকে দেওয়া হয়েছিল এবং এর ফলেই বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন সংঘটিত হয়।

অন্যদিকে আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান শুরু থেকেই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। তাদের আইনজীবীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিরক্ষা উপস্থাপন করতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞ অপরিহার্য। তাদের মতে, বিচারের ন্যায়সংগততা নিশ্চিত করতে বিদেশি আইনজীবীর অংশগ্রহণ কাঙ্ক্ষিত ছিল। তবে ট্রাইব্যুনালের প্রত্যাখ্যানের পর এখন প্রতিরক্ষা পক্ষকে স্থানীয় আইনজীবীদের মাধ্যমেই পরবর্তী লড়াই চালাতে হবে।

এই মামলাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সমর্থকরা দাবি করছেন, মামলার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করেন, আন্দোলন তখন যে মাত্রায় সহিংসতা ছড়িয়েছিল তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার হওয়াই উচিত। তবে বিদেশি আইনজীবীর বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত এ বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এ ধরনের মামলায় বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের অনুমতি দিয়ে উদাহরণ তৈরি হলে ভবিষ্যতে আরও মামলায় আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার দাবি উঠতে পারে। ট্রাইব্যুনাল মনে করে, সেই পথ খুলে দিলে বিচার ব্যবস্থার কাঠামো, নিরাপত্তা, প্রক্রিয়া ও গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। আদালতের এই ব্যাখ্যা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষার যৌক্তিকতা থেকে এসেছে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

তবে অন্য একটি অংশ বলছে, যেহেতু মামলাটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই বিদেশি বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারত। ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ফলে এখন পুরো নজর আগামী ১৭ ডিসেম্বরের শুনানির দিকে। সেদিন অভিযোগ গঠন হবে কি না—এ সিদ্ধান্ত মামলার অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল এই মামলার রায় ও বিচার প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মামলা যত এগোবে, ততই নতুন তথ্য ও বিতর্ক সামনে আসবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করেছে, বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমা অতিক্রম করার ইচ্ছা এখনো আদালতের নেই।

এই মামলার পরবর্তী ধাপ কী হবে, অভিযোগ কীভাবে গঠিত হবে এবং আদালত কোন প্রমাণকে কতটা গুরুত্ব দেবে—সবকিছুই এখন সময়ের অপেক্ষা। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, মামলাটি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচার হয়ে উঠছে এবং প্রতিটি পদক্ষেপই জনমত ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত