হাসিনার নির্দেশে ঢাবিতে ইসরাইলি কায়দায় হামলা’—সাদিক কায়েম

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৮ বার
সাদিক কায়েম

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন শিক্ষার্থীদের ওপর গত বছরের ১৪ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর নতুন অভিযোগের কারণে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সম্পর্কিত একটি মামলায় জবানবন্দি দিতে এসে তিনি প্রেস ব্রিফিংয়ে বিস্তৃত বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর যে হামলা হয়েছিল, তা নাকি হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে এবং তা “ইসরাইলি কায়দায়” পরিচালিত হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য—হামলার ধরণ ও নির্মমতার মাত্রা তাঁকে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর হামলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

সাদিক কায়েম বলেন, ১৪ জুলাইয়ের আন্দোলনটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক অনিয়ম, একাডেমিক সমস্যা এবং জাতীয় রাজনীতিতে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদে মাঠে নেমেছিল। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার ও রাজাকারের নাতি-নাতনি’ বলে যে মন্তব্য করেন, সেই মন্তব্যের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। হাজারো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে নেমে আসে, এবং ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ উত্তাল হয়ে ওঠে।

ভিপির অভিযোগ মতে, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালকে শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এর পরপরই উপাচার্য তাঁর বাসভবনে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের ডেকে বহিরাগতদের সাথে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর পরিকল্পনা করেন। ছাত্রলীগের টপ লেভেলের নেতৃত্ব—সাদ্দাম, ইনান, শয়ন, সৈকত—এদের প্রত্যেককেই তিনি অভিযুক্ত করেন। তাঁর দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী বাইরে থেকে আনা লোকজনকে ব্যবহার করে এক ধরনের ‘সাংগঠনিক ও পরিকল্পিত হামলা’ চালানো হয়েছিল।

পরদিন ১৫ জুলাই রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ডাকসুর উদ্যোগে একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সাদিক কায়েম বলেন, এই সমাবেশ ছিল সংঘাতমুক্ত, অহিংস এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারের দাবি জানানোর একটি অনুশীলন। কিন্তু সেখানে নাকি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মী-সমর্থকেরা হঠাৎ করে বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে অতর্কিতে হামলে পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর ‘নির্মম, মানবতাবিরোধী’ আক্রমণ চালায়। তাঁর বর্ণনায়, হামলার লক্ষ্য ছিল ভয় দেখানো, দমন করা এবং শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়া।

সাদিক কায়েম বলেন, আহত শিক্ষার্থীদের সেদিন ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পথে বারবার হামলার শিকার হতে হয়েছিল। গাড়িতে থাকা আহতদের বের করে মারধর করা হয়েছিল বলেও তাঁর অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, কয়েকজন গুরুতর আহত শিক্ষার্থীকে নিকটবর্তী প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে গেলে সেখানে প্রবেশের সময়ও হামলা হয়েছিল। তাঁর বর্ণনায়, “ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনিদের ওপর যেভাবে আক্রমণ চালায়, সেদিন আমাদের ওপর সেই কায়দাতেই আক্রমণ হয়েছিল”—এই তুলনা তিনি করেন হামলার ধরন ও নির্দয়তার প্রেক্ষিতে।

সাদিক কায়েমের বক্তব্যে তিনি বারবার ‘রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার’, ‘প্রশাসনিক পরিকল্পনা’ এবং ‘রাজনৈতিক নির্দেশে হামলা’—এই অভিযোগগুলো তোলেন। তিনি দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য প্রতিবাদকে সরকার ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংসতায় রূপ দেয় এবং এভাবে ছাত্র আন্দোলনকে দমন করার ইতিহাস আবারও ফিরে আসে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের যৌথ ভূমিকা সেদিনের ঘটনাকে আরও নৃশংস করে তোলে।

তবে তাঁর এই বক্তব্যের বিপরীতে সরকারি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অতীতে এই অভিযোগগুলো বিভিন্ন সময়ে অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। ছাত্রলীগের নেতারা দাবি করেছেন, সেদিনের ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল শিক্ষার্থীদের একটি অংশের উত্তেজনাকর আচরণের কারণে। তারা বরাবরই বলেন, ছাত্রলীগ কখনোই অসহিংস আন্দোলনে হামলার নীতি অনুসরণ করে না। তবে সাদিক কায়েমের সর্বশেষ অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে সেদিনকার ঘটনাগুলো নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। অনেক শিক্ষক মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল পরিস্থিতি শান্ত রাখা, কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তাতে প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী আচরণ করেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ আন্দোলনের পরিণতি কখনোই সহিংসতায় গড়ানো উচিত ছিল না। বিশেষ করে বহিরাগতদের অংশগ্রহণের অভিযোগ তাদের মনে আরও ক্ষত তৈরি করেছে।

শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও ঘটনাটিকে আরও করুণ করে তুলে। অনেকেই সেদিনের হামলার কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন— কারও হাত ভেঙেছিল, কারও মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছিল, কেউ কেউ কয়েক দিন পর্যন্ত হাসপাতালে অচেতন অবস্থায় ছিলেন। তারা অভিযোগ করেন, হামলার পর যেসব মেডিকেল সেন্টার বা ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন, সেখানেও তাড়া করা হয়েছিল তাদের। এই প্রসঙ্গ টেনে সাদিক কায়েম বলেন, “মানুষ যখন আহত হয়ে জীবন বাঁচাতে দৌড়ায়, তখন তাকে আঘাত করা মানবতার বিরুদ্ধেই নয়, তা সভ্যতার বিরুদ্ধেও।”

এই ঘটনার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহিংসতা রোধ, শিক্ষার্থীদের অধিকার সুরক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতির সহিংস চক্রের বাইরে রাখার দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। গবেষকরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বাধীন শিক্ষার পরিবেশ হওয়া উচিত, যেখানে কোনোক্রমেই শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক শক্তির জুলুম চলতে পারে না। তারা আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে—যা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কোনো সরকারই এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ রাখে না।

একই সঙ্গে এই অভিযোগ ও পাল্টা-অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের আলোচনার সূত্রপাত করেছে। সাদিক কায়েমের বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তাপে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে, বিশেষত ‘ইসরাইলি কায়দায় হামলা’—এই তুলনার কারণে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কিছু পর্যবেক্ষক এই তুলনাকে প্রতীকী হিসেবে দেখলেও ঘটনা তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।

ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ১৪–১৫ জুলাইয়ের হামলা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এখনো সেই দিনের বিচার দাবি করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দাবি করেছে, নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়। তবে সরকারি পক্ষ একাধিকবার বলেছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থেই যা করার প্রয়োজন ছিল, সেটাই করা হয়েছিল।

এই দ্বন্দ্ব, বিতর্ক ও ভিন্নমতের মাঝেই ভিপি সাদিক কায়েমের নতুন করে তোলা অভিযোগ জনমনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়—এ তিনটি ইস্যুই আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত