আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর অভিযোগ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর অভিযোগ

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য, দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অনলাইন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আবারও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। শনিবার খুলনায় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে গুম, বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তাদের মতে, এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া ভবিষ্যতে টেকসই গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

শনিবার সকালে খুলনার একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারা সংঘটিত নির্যাতন, এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনে কী বলা হয়েছে এবং বাস্তব পরিস্থিতি কী’ শীর্ষক এই সেমিনারে মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং ভুক্তভোগীরা অংশ নেন। অধিকার-এর পরিচালক এএসএম নাসিরুদ্দিন এলানের সঞ্চালনায় সভায় গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন পুলক হাসান। উপস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন এবং বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আলোকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, গত প্রায় দেড় দশকে র‌্যাব ও পুলিশকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন, অপহরণ, হয়রানিমূলক মামলা এবং ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল—এমন অভিযোগ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাদের মতে, এসব অভিজ্ঞতা থেকে রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নেওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে। বক্তারা সতর্ক করে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে আবার রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হলে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে থাকা শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ বাড়তে পারে এবং এর পরিণতিতে দেশ নতুন করে অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।

সভাপতিত্ব করেন মুহাম্মদ নুরুজ্জামান। অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আক্তার হোসেন, খুলনার জেল সুপার নাসির উদ্দিন প্রধান, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (সাউথ) তাজুল ইসলাম এবং মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের শিক্ষক ডা. রনি কুমার। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আইনের শাসন, পেশাগত দায়িত্ব এবং মানবাধিকার সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। প্রশাসনের প্রতিনিধিরা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ, জবাবদিহি এবং পেশাদারিত্ব বাড়ানো গেলে অতীতের ভুল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

আলোচনায় খুলনা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক, বিএফইউজের সহকারী মহাসচিব ও বিভিন্ন মামলার ভুক্তভোগী এহতেশামুল হক শাওন, এমইউজের সভাপতি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় হয়রানির শিকার রাশিদুল ইসলাম, এনটিভির খুলনা ব্যুরোপ্রধান আবু তৈয়ব, ইউএনবির খুলনা ব্যুরোপ্রধান শেখ দিদারুল আলম এবং আইসিটি আইনে মামলার মুখোমুখি হওয়া সিনিয়র সাংবাদিক কাজী মোতাহার রহমান বাবু বক্তব্য দেন। তারা বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে এবং এর ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও সভায় তাদের অভিমত তুলে ধরেন। খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দা রেহানা আক্তার, জামায়াতে ইসলামীর মহানগর সহকারী সেক্রেটারি আজিজুল ইসলাম ফরাজি, নাগরিক ঐক্যের জেলা সভাপতি আব্দুল মজিদ এবং গণসংহতি আন্দোলনের সংগঠক ফরহাদ হাসান রাজ বলেন, ক্ষমতার পালাবদল হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার মানসিকতায় পরিবর্তন না এলে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে না। তাদের মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের শুরু থেকেই নিজেদের জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে।

সভায় মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম, মানবাধিকার কর্মী শেখ ফারুক ও শহিদুল ইসলামও বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে না দেখে আইনি ও মানবিক দৃষ্টিতে বিচার করা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

আলোচনার এক পর্যায়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, অতীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন, গুম ও দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার অভিজ্ঞতা তাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যদিও এসব বর্ণনা ছিল সংযত ও মানবিক, তবুও তা শ্রোতাদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করে। বক্তারা বলেন, এসব অভিজ্ঞতা কেবল ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নও তুলে ধরে।

বক্তারা আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সমাজে সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। আগামী দিনে কারা ক্ষমতায় আসবেন—এই হিসাবের কারণে পেশাগত নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন কয়েকজন বক্তা।

তাদের মতে, এই সুযোগে সমাজে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব এবং সংঘর্ষ বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা গেলে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে।

সমগ্র আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার ও মানবাধিকারসম্মত কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। অধিকার আয়োজিত এই সেমিনার সেই দাবিকে নতুন করে সামনে এনেছে এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত