প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সাংবাদিক আনিস আলমগীর, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগটি করা হয়েছে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায়। রোববার রাতে জুলাই রেভ্যুলেশনারী এলায়েন্সের কেন্দ্রীয় সংগঠক আরিয়ান আহমেদ থানায় উপস্থিত হয়ে এ অভিযোগ দায়ের করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগে আনিস আলমগীর ও মেহের আফরোজ শাওনের পাশাপাশি আরও দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন মারিয়া কিশপট্ট এবং ইমতু রাতিশ ইমতিয়াজ। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলেও তার অনুসারীরা বিভিন্ন কৌশলে দেশে অবস্থান করে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্টের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগকারীর দাবি, এই চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশনের বিভিন্ন টকশোর মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করার অপচেষ্টা করছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিয়মিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোকে উৎসাহিত করছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পথ তৈরি করতে চেয়েছেন এবং এর ফলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত কর্মীরা অনুপ্রাণিত হয়ে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের উদ্দেশ্যে সহিংস ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
অভিযোগে রাষ্ট্রের অবকাঠামো ধ্বংস, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে উসকানির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, এসব বক্তব্য ও প্রচারণা কেবল মতপ্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সংঘবদ্ধভাবে রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ সংঘটনের পরিবেশ তৈরি করছে, যা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য।
এই অভিযোগ দায়েরের প্রেক্ষাপটে একই রাতে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি জানান, আনিস আলমগীরকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে এবং তার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জানানো হবে।
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, রোববার সন্ধ্যার দিকে ধানমন্ডি ২ নম্বর এলাকায় অবস্থিত একটি জিম থেকে বের হওয়ার পর আনিস আলমগীরকে হেফাজতে নেওয়া হয়। জিমটির ম্যানেজার আরেফিন গণমাধ্যমকে জানান, আনিস আলমগীর সন্ধ্যায় নিয়মিত ব্যায়ামের জন্য জিমে এসেছিলেন এবং রাত আনুমানিক ৮টার দিকে বের হয়ে যান। তার দাবি অনুযায়ী, জিমের ভেতরে পুলিশের উপস্থিতি তিনি লক্ষ্য করেননি।
এদিকে, অভিযোগে নাম থাকা অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন বা অন্য অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নানা আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন তুলে তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযোগ দায়ের একটি গুরুতর বিষয় এবং এর ক্ষেত্রে তদন্তে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। একই সঙ্গে তারা বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন, আবার নির্দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের হয়রানি বন্ধ করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এই অভিযোগ তারই একটি প্রতিফলন। একদিকে রয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠন ও তাদের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতভিন্নতার প্রশ্ন। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত কিছু জানানো সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
সব মিলিয়ে, সাংবাদিক আনিস আলমগীর ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ চারজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযোগ দায়েরের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নতুন করে প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ।