প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা: জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের পরবর্তী শুনানি আগামী ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। বিচারপতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ।
সোমবার সকালেই আসামিদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপক্ষ বা প্রসিকিউশন এ মামলার বিস্তারিত অভিযোগ উপস্থাপন করে। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, এই মামলাটি জুলাই বিপ্লবের সময়ে সংঘটিত গুরুতর মানবতাবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তিনি উল্লেখ করেন, আসামিরা ছাত্র-জনতাকে দমন করতে কারফিউ জারি করা, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করার জন্য নির্দেশ প্রদান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লেথাল উইপেন ব্যবহার করে অসংখ্য ছাত্র ও সাধারণ নাগরিক হত্যা ও আহত করার দায়ে দায়ী।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আসামিদের সুপারিওর রেসপন্সিবিলিটি বা সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ঘটানো এই কার্যক্রমের ফলে সাধারণ জনগণ এবং ছাত্র-জনতার উপর ব্যাপক মানবিক ক্ষতি হয়েছে। প্রমাণাদি ও সাক্ষীর মাধ্যমে দেখানো হবে যে, এই দমনমূলক পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে তাদের নির্দেশনায় ও তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে।
আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবী মনসুরুল হক অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে সময় চেয়ে আবেদন করেন। আদালত আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানির পরবর্তী দিন ৪ জানুয়ারি নির্ধারণ করে। এই দিন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন এবং বিচার কার্যক্রমের পরবর্তী পর্যায় শুরু হবে।
মামলার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গেলে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যদিয়ে ১৩ আগস্ট সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর থেকে তারা কারাগারে অবস্থান করছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয় ৪ ডিসেম্বর। এরপর থেকে আদালত প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নির্বাহী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, মামলাটির ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আদালতে সুষ্ঠু উপস্থাপনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়েছে। কারণ এই মামলার ঘটনাগুলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিচারিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, মামলার পরবর্তী শুনানি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি শুধু দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সক্ষমতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করবে।
সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক রাজনৈতিকভাবে সুপরিচিত ব্যক্তি। তাদের বিরুদ্ধে এই মামলার অভিযোগ শোনার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং মানবাধিকারের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা জনগণ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এ কারণে মামলাটির প্রতি সাধারণ জনগণের আগ্রহও তীব্র।
সুশীল সমাজের একাংশ এই মামলাকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও মানবাধিকার এবং বিচার প্রক্রিয়ার যথাযথতা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। তারা বলছে, অপরাধী যেই রাজনৈতিক পরিচয়ই হোক না কেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তার থেকে আলাদা নয়।
আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ যথাযথ প্রমাণ, সাক্ষী এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আদালতে অভিযোগ উপস্থাপন করছে। আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করা এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা।”

অপরদিকে, আসামিদের পক্ষে মনসুরুল হক জানান, “আমরা আদালতের সমস্ত প্রক্রিয়ার সম্মান করি এবং আশা করি, আসন্ন শুনানিতে সব তথ্য প্রমাণের আলোকে ন্যায্য এবং সংবেদনশীল বিচার হবে। আসামিরা নিজেদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন।”
এই মামলার পরবর্তী শুনানি দেশের রাজনৈতিক ও আইন-আদালত পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে। বিশেষ করে রাজনীতি, মানবাধিকার ও বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল এক নজরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। শুনানার দিনটি শুধু সালমান ও আনিসুল হকের জন্য নয়, দেশের গণতান্ত্রিক ও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।
সংক্ষেপে, জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পরবর্তী শুনানি ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। মামলাটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যথাযথ প্রয়োগ, মানবাধিকার রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আসন্ন শুনানায় আদালত প্রমাণ, সাক্ষী এবং আসামিদের যুক্তি যাচাইয়ের মাধ্যমে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।