প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় আজ মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে যাচ্ছে বিচারিক প্রক্রিয়া। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১২ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ দেওয়ার জন্য আজ ২৩ ডিসেম্বর দিন ধার্য রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে এই মামলাটি দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। বিচারিক প্যানেলের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আজ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত ২১ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়ার কথা থাকলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল বিশেষ শুনানির অনুমতি দেয়। ওই শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগের আইনি ভিত্তি, সাক্ষ্যপ্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন।
গত ১৪ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে মামলার শুনানিতে একাধিক আইনজীবী অংশ নেন। তিনজন আসামির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ এবং সাতজনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী তাবারক হোসেন। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. আমির হোসেন। পাশাপাশি পলাতক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ছয়জন আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে শুনানি করেন এম. হাসান ইমাম ও সুজাদ মিয়া। শুনানিতে প্রত্যেক আইনজীবী নিজ নিজ মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানান এবং দাবি করেন, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অন্যদিকে প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রসিকিউটর গাজী এম. এইচ. তামীম ট্রাইব্যুনালে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, টিএফআই সেলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতাভুক্ত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে পূর্ণাঙ্গ বিচার শুরুর আবেদন জানান। প্রসিকিউশনের দাবি, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্যপ্রমাণ, ভুক্তভোগীদের বর্ণনা এবং নথিপত্র অভিযোগ গঠনের জন্য যথেষ্ট শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
এই মামলায় মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন ১০ জন, যাদের আজ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে। গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো. কামরুল হাসান, মো. মাহাবুব আলম ও কে. এম. আজাদ। এছাড়া কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর-প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন এবং মো. সারওয়ার বিন কাশেমকেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এই সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টিএফআই সেলে আটক ব্যক্তিদের গুম, বেআইনি আটক ও নির্যাতনের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অন্যদিকে মামলার বাকি সাত আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এম. খুরশীদ হোসেন, মো. হারুন অর রশিদ এবং লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার বিষয়টি আগেই আলোচনায় এসেছে।
টিএফআই সেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল। বিভিন্ন সময় গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার অভিযোগ করে আসছে, তাদের স্বজনদের বেআইনিভাবে আটক রেখে নির্যাতন করা হয়েছে এবং অনেকের ভাগ্য আজও অজানা। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতেই তদন্ত শুরু হয় এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি গড়ায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার বিচার শুধু ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারিক নজির হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও মামলাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সম্ভাবনাকে কেউ কেউ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির অংশ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্য এক জায়গায় মিলেছে—তারা বিচার চান এবং দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান দেখতে চান।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আজ যদি ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন, তাহলে মামলাটি আনুষ্ঠানিক বিচারের পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্কের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের মামলায় আজকের দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ গঠনের আদেশের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া কোন পথে এগোয়, সেটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেশবাসী, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক মহল।