প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ওবায়দুল কাদেরের পালিত পুত্রের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করার মধ্য দিয়ে আলোচিত একাধিক দুর্নীতি ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এলো। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথিত পালিত পুত্র আসাদুজ্জামান, তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান এবং তাঁদের সহযোগী আক্তারুজ্জামানের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের অবকাশকালীন বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন এই আদেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত শুনানি শেষে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা তানজীর আহমেদ।
দুদকের পক্ষে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক নাছরুল্লাহ হোসাইন আদালতে আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আসাদুজ্জামান ও তাঁর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চোরাচালান, হুন্ডি ব্যবসা, শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে তাঁদের আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অনুসন্ধান চলাকালে বিশ্বস্ত সূত্রে দুদকের কাছে তথ্য এসেছে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যেকোনো সময় দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের দেশত্যাগের সুযোগ দিলে অনুসন্ধান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাঁদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জরুরি বলে দুদক আদালতকে অবহিত করে।
শুনানি শেষে আদালত দুদকের যুক্তি ও উপস্থাপিত তথ্য বিবেচনায় নিয়ে আসাদুজ্জামান, ইসরাত জাহান ও আক্তারুজ্জামানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন। আদালতের এই আদেশের ফলে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁরা কেউই দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।
আসাদুজ্জামানকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ও বিতর্ক চলছিল। তাঁকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পালিত পুত্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো পারিবারিক নথি বা বক্তব্য আগে সামনে আসেনি। তবে রাজনৈতিক পরিচিতি ও প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ বিভিন্ন সময় গণমাধ্যম ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক নথি এবং বিদেশে সম্ভাব্য সম্পদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আরও তথ্য চাওয়া হবে। একই সঙ্গে শুল্ক ও রাজস্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা সাধারণত অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এতে করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় এবং তদন্তে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য সংগ্রহ সহজ হয়। বিশেষ করে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো মামলায় এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ভূমিকা রাখে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতের এমন আদেশ দেশের দুর্নীতি বিরোধী কার্যক্রমে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। এটি দেখাচ্ছে যে, অভিযোগের গুরুত্ব ও প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত সংস্থাগুলো আইনি পদক্ষেপ নিতে পিছপা হচ্ছে না।
তবে একই সঙ্গে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বলেও মত প্রকাশ করছেন অনেকে। তাঁদের মতে, অনুসন্ধান ও বিচার প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো পক্ষপাত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ উঠলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হতে পারে।
এদিকে আদালতের আদেশের পর থেকে আসাদুজ্জামান ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের আইনজীবীরাও এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাঁরা উচ্চ আদালতে আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারেন বলেও জানা গেছে।