প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ছাত্রদল নেতা হত্যা মামলা আবারও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় ছাত্রদলের এক নেতাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের ১২ জন নেতাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। এই ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতি, দলীয় সহিংসতা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৭ ডিসেম্বর বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ১৭ নম্বর ইউনিয়নে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের উদ্যোগে মিষ্টি বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ওই কর্মসূচিকে ঘিরে একই এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে উভয় পক্ষ।
সংঘর্ষ চলাকালে ছাত্রদলের ইউনিয়ন সহ-সভাপতি রবিউল ইসলাম গুরুতরভাবে আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথেই তার মৃত্যু হয়। তরুণ এই ছাত্রদল নেতার মৃত্যু মুহূর্তেই পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
নিহত রবিউলের বাবা মিজানুর রহমান এ ঘটনায় বাদী হয়ে বাবুগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের মোট ২১ জন নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, পরিকল্পিতভাবে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে রবিউলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরিবার দাবি করেছে, এটি নিছক সংঘর্ষ নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ড।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে মামলার কিছু আসামি উচ্চ আদালত থেকে আগাম বা নিয়মিত জামিন নিয়ে বাইরে ছিলেন। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) ওই মামলার ১২ জন আসামি বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন।
বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ফারুক হোসেন উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। আদালতের এই আদেশের মাধ্যমে মামলাটি নতুন মোড় নেয় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় ওঠে।
কারাগারে পাঠানো আসামিরা হলেন বাবুগঞ্জ উপজেলার ঠাকুর মল্লিক এলাকার বাসিন্দা ছাত্রদল নেতা নাবিদ হাসান শান্ত, মিজানুর রহমান কবিরাজ, মো. বাবুল হাওলাদার, সফিউল আজম শাহিন ফরাজী, এমদাদুল হক মিলন ও তার ভাই জহিরুল ইসলাম, সাইদুর রহমান, মো. সোহাগ, সফিকুল ইসলাম সবুজ হাওলাদার, রফিক মুন্সি, সুমন ব্যাপারী এবং আব্দুল্লাহ হাওলাদার।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী কামরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, এই ১২ জন আসামি আগে উচ্চ আদালতের দেওয়া জামিনে মুক্ত ছিলেন। জামিনের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারা আইন অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে নতুন করে জামিন আবেদন করেন। তবে মামলার গুরুত্ব, অভিযোগের ধরন ও তদন্তের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এ ঘটনায় নিহত রবিউলের পরিবার আদালতের সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। রবিউলের বাবা মিজানুর রহমান বলেন, “আমার ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি চাই, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাই আইনের আওতায় আসুক এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাক। আদালতের এই সিদ্ধান্তে আমরা ন্যায়বিচারের আশা দেখছি।”
অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতারা দাবি করেছেন, এই মামলায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের নেতাদের হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক পক্ষকে টার্গেট করা হচ্ছে। তারা আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা ভাবছেন বলেও জানিয়েছেন।
আইন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্ররাজনীতি ও দলীয় সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি সংকট। প্রায়ই ছোটখাটো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য হুমকি। তারা মনে করেন, এই ধরনের মামলায় নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অপরাধীরা শাস্তি পায় এবং নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হয়।
বরিশালের বাবুগঞ্জ এলাকায় বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।