শ্রীমঙ্গলে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা, শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৪ বার
শ্রীমঙ্গলে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ও শৈত্যপ্রবাহের শঙ্কা

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শীত এবার যেন সময়ের আগেই নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে। জানুয়ারির শুরুতেই ঘন কুয়াশা, হিমেল হাওয়া আর কনকনে ঠান্ডায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বৃহস্পতিবার সকালে শ্রীমঙ্গলে চলতি শীত মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য একদিকে নতুন অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম এবং এটি সামনে শৈত্যপ্রবাহের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় এই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এর আগে কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছিল। হঠাৎ করেই এক ধাক্কায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে বাড়তি দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। কারণ জানুয়ারির শুরুতেই এমন তীব্র শীত সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস হিসেবেই ধরা হয়।

আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, শ্রীমঙ্গলের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানকার তাপমাত্রা প্রায়ই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কম থাকে। পাহাড়, চা-বাগান আর ঘন সবুজের কারণে শীতের সময় এখানে কুয়াশার প্রকোপও বেশি দেখা যায়। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত এতটাই ঘন কুয়াশা ছিল যে, কয়েক হাত দূরের কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। এর ফলে সড়কে যানবাহন চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন এলাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।

গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছিল। সেই সময়ও শীত নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। তবে এবছরের ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপমাত্রা সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই যদি তাপমাত্রা এভাবে নেমে আসে, তাহলে সামনে আরও কয়েক দফা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শীতের এই তীব্রতা সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষদের। ভূনবীর ইউনিয়নের দিনমজুর শুকুর মিয়া বলেন, কুয়াশা আর ঠান্ডায় বাইরে বের হওয়াই কষ্টকর হয়ে গেছে। ভোরে কাজে বের হতে গেলে শরীর কাঁপে, হাত-পা শক্ত হয়ে আসে। কিন্তু কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে—এই চিন্তায় ঠান্ডা উপেক্ষা করেই বের হতে হচ্ছে। তার মতো আরও অনেক শ্রমজীবী মানুষ শীতের কষ্টের কথা জানালেও জীবিকার তাগিদে থেমে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন না।

শান্তিবাগ এলাকার রিকশাচালক সাধন দাশের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি বলেন, ভোরে রিকশা নিয়ে বের হয়েছি, কিন্তু সকাল ৯টা পর্যন্ত কোনো যাত্রী পাইনি। কুয়াশার কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আয় না হলে সারাদিনের খরচই ওঠে না। এখনই যদি এমন শীত পড়ে, সামনে কী হবে বুঝতে পারছি না। তার কথায় স্পষ্ট, শীত শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, অনেকের জন্য এটি সরাসরি জীবিকার ওপর আঘাত হয়ে এসেছে।

চা-বাগান এলাকাগুলোতেও শীতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সকালে কুয়াশা কাটতে দেরি হওয়ায় চা-পাতা সংগ্রহের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। বাগানের শ্রমিকরা জানান, কনকনে ঠান্ডায় ভেজা পাতার মধ্যে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ঠান্ডার মধ্যে থাকায় সর্দি, কাশি ও জ্বরের মতো রোগের প্রকোপও বাড়ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে শীতজনিত অসুস্থতার রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান জানান, প্রতিদিনই শীতের তীব্রতা বাড়ছে। আজ সকালে তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন। আবহাওয়ার বর্তমান ধারা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, সামনের দিনগুলোতে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে রাত ও ভোরের দিকে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে। তিনি সবাইকে শীতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিবছরই শ্রীমঙ্গলে শীত মৌসুমে অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে অনেককে খোলা আকাশের নিচে বা জরাজীর্ণ ঘরে রাত কাটাতে হয়। এবছর শীতের শুরুতেই তাপমাত্রা এতটা কমে যাওয়ায় দ্রুত সহায়তা কার্যক্রম শুরু করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই শীত কতদিন থাকবে এবং কতটা ভয়াবহ আকার নিতে পারে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত শীতের তীব্রতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে একাধিক শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে, যা উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের মতো এলাকায় বেশি প্রভাব ফেলবে।

সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গলে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতার নাম। কুয়াশা, ঠান্ডা আর অনিশ্চয়তার এই দিনে শীত মোকাবিলায় সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং মানবিক সহায়তাই হতে পারে সবচেয়ে বড় ভরসা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত