প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিনাজপুরে শীতের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। হিমেল হাওয়া, ঘন কুয়াশা আর নিম্ন তাপমাত্রার কারণে উত্তরের এই জেলা কার্যত কাঁপছে শীতে। বুধবার ভোর ৬টায় দিনাজপুরে চলতি মৌসুমের অন্যতম সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৬ শতাংশ, যা শীতের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ, সূর্যের অনুপস্থিতি আর হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘন কুয়াশা নেমে আসে দিনাজপুর শহর ও আশপাশের এলাকায়। সড়কগুলোতে কয়েক হাত দূরের কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। এর ফলে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, অনেক বাস ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হয় এবং কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে চলাচল বন্ধও থাকে। বিশেষ করে দিনাজপুর-রংপুর, দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর-পঞ্চগড় সড়কে ভোগান্তির চিত্র বেশি দেখা গেছে। কুয়াশার কারণে ট্রেন চলাচলেও সময়সূচিতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
শীতের এই প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষকে। দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, কৃষিশ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষেরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। ভোরে কাজে বের হতে না পেরে অনেকেই আয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে অনেকে কনকনে ঠান্ডার মধ্যেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শহরের ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষেরা শীতের তীব্রতায় আরও অসহায় হয়ে পড়েছেন।
দিনাজপুরের গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও একই চিত্র। ভোরের দিকে জমিতে শিশির জমে থাকায় কৃষিকাজে ব্যাঘাত ঘটছে। অনেক কৃষক জানান, সকালে মাঠে নামা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আলু, ভুট্টা, গম ও সবজি চাষে যুক্ত কৃষকেরা কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছেন। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত শৈত্যপ্রবাহ না হলে এই ঠান্ডা কিছু কিছু ফসলের জন্য উপকারীও হতে পারে, যদিও দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
দিনাজপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবেই তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তাঁর মতে, আগামী কয়েক দিন সকাল ও রাতের দিকে শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ঘন কুয়াশা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দিনের বেলায় সূর্যের দেখা মিললেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না, ফলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারছে না।
শীতের এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার সমস্যা নিয়ে শিশু ও বয়স্কদের হাসপাতালে আসার হার বেশি। চিকিৎসকদের মতে, এই বয়সী মানুষদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকায় শীতের সময় তাদের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন।
চিকিৎসকরা গরম কাপড় ব্যবহারের পাশাপাশি উষ্ণ খাবার গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন। পর্যাপ্ত পানি পান, ঠান্ডা এড়িয়ে চলা এবং ভোর ও রাতের দিকে বাইরে বের হলে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের ক্ষেত্রে ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি বেশি থাকায় অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বয়স্ক ও দীর্ঘদিনের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় শীতবস্ত্রের দোকানগুলোতে ক্রেতার ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষজন সামর্থ্য অনুযায়ী সোয়েটার, জ্যাকেট, কম্বল ও মাফলার কিনছেন। তবে অনেক দরিদ্র মানুষের পক্ষে এসব কেনা সম্ভব হচ্ছে না। সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত শীতবস্ত্র বিতরণ করা গেলে অসহায় মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।
শীতের তীব্রতায় শিক্ষার্থীরাও পড়েছে ভোগান্তিতে। ভোরে কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারছে না। অভিভাবকেরা জানান, ছোট শিশুদের ঠান্ডায় অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কায় অনেক সময় স্কুলে পাঠাতে দ্বিধা হচ্ছে। যদিও এখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
দিনাজপুরের মতো উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলাতেও শীতের একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, জানুয়ারি মাস সাধারণত দেশের সবচেয়ে শীতল সময়। এই সময়ে একাধিক শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সামনে আরও কয়েক দিন ঠান্ডা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, দিনাজপুরে শীত এখন কেবল আবহাওয়ার খবর নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। কুয়াশা, হিমেল হাওয়া ও নিম্ন তাপমাত্রা একসঙ্গে মানুষের চলাচল, কাজকর্ম, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। সরকারি সংস্থা, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও বিত্তবান মানুষের সহযোগিতায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই পারে এই দুর্ভোগের সময়ে মানবিকতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠতে।