চিরবিদায় নিলেন চলচ্চিত্রের ধ্যানী সাধক বেলা তার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২১ বার
চিরবিদায় নিলেন চলচ্চিত্রের ধ্যানী সাধক বেলা তার

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের আকাশে নীরবতা, দীর্ঘ শট ও অস্তিত্ববাদী বোধকে যিনি শিল্পের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই কিংবদন্তি নির্মাতা বেলা তার আর নেই। ‘সাতানতাঙ্গো’ ও ‘দ্য তুরিন হর্স’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের এই হাঙ্গেরিয়ান পরিচালক দীর্ঘদিনের গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে মঙ্গলবার ভোরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তার প্রস্থান বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

হাঙ্গেরিয়ান ফিল্ম আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন এক শোকবার্তায় বেলা তারের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, দীর্ঘ ও কঠিন অসুস্থতার পর এই মহান নির্মাতা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। শোকাহত পরিবার এই দুঃসময়ে গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। তার মৃত্যুর খবরে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলচ্চিত্রপ্রেমী, নির্মাতা ও সমালোচকদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

১৯৫৫ সালে হাঙ্গেরির দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয় শহর পেচে জন্মগ্রহণ করেন বেলা তার। শৈশব থেকেই সমাজ ও মানুষের জীবনের টানাপোড়েন তাকে গভীরভাবে নাড়া দিত। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে পাওয়া একটি ক্যামেরাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই ক্যামেরা দিয়েই শ্রমজীবী মানুষ, পারিবারিক সংকট ও সামাজিক বাস্তবতাকে ধারণ করতে শুরু করেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার আগেই তার চলচ্চিত্র ভাবনা হয়ে ওঠে প্রচলিত ধারার বাইরে।

পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্ত হন হাঙ্গেরির প্রখ্যাত নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান বেলা বালাজ স্টুডিওতে। এই স্টুডিওই তাকে স্বাধীনভাবে ভাবার ও নির্মাণের সুযোগ করে দেয়। ১৯৭৭ সালে এখান থেকেই নির্মাণ করেন তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ফ্যামিলি নেস্ট’। এই ছবিতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, দীর্ঘ শটের ব্যবহার এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনের প্রতি গভীর সহানুভূতি। সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও শুরুতে তার কাজ সহজবোধ্য বা জনপ্রিয় ছিল না।

১৯৮৮ সালে নির্মিত ‘ড্যামনেশন’ বেলা তারের ক্যারিয়ারে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল এনে দেয়। বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই ছবি হাঙ্গেরির প্রথম স্বাধীন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ছবিটির চিত্রনাট্য তিনি যৌথভাবে লিখেছিলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সঙ্গে। এই সহযোগিতাই পরবর্তী সময়ে বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য সৃজনশীল জুটিতে পরিণত হয়। মানুষের অস্তিত্বগত শূন্যতা, নৈতিক অবক্ষয় ও সময়ের নিষ্ঠুর প্রবাহ তাদের যৌথ কাজের মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে।

বিশ্বজুড়ে বেলা তার সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার সাত ঘণ্টা দীর্ঘ চলচ্চিত্র ‘সাতানতাঙ্গো’র জন্য। ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমা শুধু দৈর্ঘ্যের জন্য নয়, বরং তার শিল্পীসত্তা ও দর্শনগত গভীরতার জন্য চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। পূর্ব ইউরোপে কমিউনিজমের পতনের পর গ্রামীণ জীবনের ভাঙন, হতাশা ও মানবিক অবক্ষয়কে ধীর লয়ের দীর্ঘ শটে তুলে ধরেন তিনি। অনেকের কাছে ছবিটি ধৈর্যের পরীক্ষা হলেও, চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মতে এটি সময়, নীরবতা ও মানবজীবনের এক মহাকাব্যিক দলিল।

এরপর ‘ওয়ার্কমাইস্টার হারমোনিস’ ও ‘দ্য ম্যান ফ্রম লন্ডন’-এর মতো চলচ্চিত্রে বেলা তার আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করেন সমাজ, ক্ষমতা ও মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে। তার ছবিতে সংলাপের চেয়ে নীরবতা বেশি কথা বলে, ক্যামেরার ধীর গতিই হয়ে ওঠে গল্প বলার প্রধান ভাষা। এই শৈলী তাকে মূলধারার বাইরে রাখলেও বিশ্ব চলচ্চিত্রে তাকে একটি স্বতন্ত্র আসনে বসিয়েছে।

২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দ্য তুরিন হর্স’ ছিল তার শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ফ্রিডরিখ নিৎসের জীবনের এক কিংবদন্তি ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত এই ছবি মানব সভ্যতার ক্লান্তি ও অবসানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ছবির পরই বেলা তার আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেছিলেন, মানুষের সম্পর্কে তার বলার মতো সব কথা শেষ হয়ে এসেছে। যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তবে পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্মাণে আর ফেরেননি।

জীবনের শেষ পর্যায়ে নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রশিক্ষণে নিজেকে উৎসর্গ করেন বেলা তার। হাঙ্গেরি, জার্মানি ও ফ্রান্সের বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে তিনি তার অভিজ্ঞতা, দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পভাবনা ছড়িয়ে দেন। অনেক তরুণ নির্মাতার কাছে তিনি ছিলেন শিক্ষক নন, বরং এক ধরনের গুরু, যিনি সিনেমাকে জীবনের গভীর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে শিখিয়েছেন।

বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে বেলা তারের মৃত্যু এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করছেন সমালোচকরা। কান, বার্লিন ও ভেনিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব তার কাজকে বিশেষ সম্মান জানিয়েছে। অনেক খ্যাতিমান নির্মাতা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, বেলা তার তাদের চলচ্চিত্র ভাবনায় গভীর প্রভাব রেখেছেন। তার চলচ্চিত্র হয়তো সবার জন্য নয়, কিন্তু যারা তাকে বুঝেছেন, তাদের কাছে তিনি সিনেমাকে এক ধ্যানের স্তরে নিয়ে গিয়েছেন।

আজ বেলা তার নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া চলচ্চিত্রগুলো সময়ের স্রোতে অমলিন থাকবে। নীরবতা, দীর্ঘ অপেক্ষা আর মানুষের ভেতরের গভীর ক্ষয়কে যেভাবে তিনি পর্দায় তুলে ধরেছেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রে বিরল। তার প্রয়াণে এক অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, তার শিল্পচিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মাতাদের অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত