দীর্ঘ দেড় মাস পর প্রাণ ফিরল ঢাকা মেডিকেলে: ক্লাসে ফিরলেন শিক্ষার্থীরা, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উদ্যোগ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৩ বার
দীর্ঘ দেড় মাস পর প্রাণ ফিরল ঢাকা মেডিকেলে: ক্লাসে ফিরলেন শিক্ষার্থীরা, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উদ্যোগ

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দীর্ঘ দেড় মাস পর অবশেষে শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরেছে দেশের সবচেয়ে পুরনো ও অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—ঢাকা মেডিকেল কলেজ। গত ২৮ মে থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও, শনিবার ১১ জুলাই সকাল থেকে সব বর্ষের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরেছেন। শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া শুরু এবং শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি কলেজ ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে এনেছে একরাশ প্রাণচাঞ্চল্য।

শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল মূলত নিরাপদ আবাসনের নিশ্চয়তা, যথাযথ বাজেট বাস্তবায়ন ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে পাঁচ দফা প্রস্তাবনা। এই দাবিগুলো ঘিরেই সৃষ্টি হয়েছিল ব্যাপক ছাত্রআন্দোলন, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় টানা শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিতের সংকটে। কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ ঘোষণা করলেও, শিক্ষার্থীরা হল ছাড়েননি এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান চালিয়ে যান।

দীর্ঘ টানাপোড়েন ও আলোচনার পর ৯ জুলাই অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি বৈঠকে শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার হোস্টেল খুলে দেওয়া হয় এবং শনিবার সকাল থেকেই শুরু হয় ক্লাস।

শিক্ষার্থীরা জানাচ্ছেন, এই বিরতির ফলে তাদের পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তবে বড় স্বার্থের জন্য তারা এই ত্যাগকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছেন। মেডিকেলের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাফিস রাফিদ বলেন, “দীর্ঘদিন ক্লাস বন্ধ থাকায় আমাদের প্রস্তুতিতে ধাক্কা লেগেছে, কিন্তু শিক্ষকরা নিশ্চয়ই পরিকল্পিতভাবে রুটিন রিশিডিউল করে সেই ঘাটতি পূরণে সাহায্য করবেন।”

একইসঙ্গে নাজমুস সাকিব নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “আগে যেখানে পরীক্ষার আগে দশ দিন পড়তাম, এখন ছয়–সাত দিনেই প্রস্তুতি নিতে হবে। সময় কম, কিন্তু পথ খুঁজে নিতে হবে।”

শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও রয়েছে সমস্যা মোকাবেলার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি। কলেজের অধ্যক্ষ ডা. কামরুল আলম জানান, “শিক্ষার্থীরা এখন পড়াশোনায় ফিরেছে, এখন আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো তাদের সিলেবাসের ঘাটতি পূরণ করা। আমরা দ্রুত ক্লাস বাড়ানো, রিভিশন ক্লাস ও সেশন প্ল্যান পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেব।”

শিক্ষার্থীদের দাবির মূল উৎস ছিল অনিরাপদ ও অপর্যাপ্ত আবাসন সমস্যা। বিশেষ করে কাঁচাবাজার, টিউবওয়েল ও খাবার জলের অভাবে ছাত্রাবাসগুলোর পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। সেই সঙ্গে পুরনো ভবনের ঝুঁকি ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী চাপ যুক্ত করেই শিক্ষার্থীরা বিকল্প আবাসন ও নতুন নির্মাণের দাবি জানান।

আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল ২৩ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আলোচনায় বসেন। যদিও সেদিন প্রত্যাশিত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হয়নি, তবে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারীর সঙ্গে আলোচনায় কিছুটা আশার আলো দেখা গিয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় তখনও ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্তে যাননি।

পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, দ্রুত নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণে বাজেট পাস, নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প আবাসনের নিশ্চয়তা, নতুন একাডেমিক ভবনের জন্য স্বতন্ত্র বাজেট, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং সব কার্যক্রমে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি রাখার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে চিকিৎসা শিক্ষার্থীরা শুধু নিজেদের দাবি তুলেই ধরেননি, বরং দেশের স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারও প্রতিফলন তুলে ধরেছেন। শিক্ষা কার্যক্রম আবার শুরু হলেও, আন্দোলনের চেতনা এবং দাবি বাস্তবায়নের পথ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন কীভাবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং শিক্ষার্থীদের আস্থার জায়গায় ফিরে আসতে পারে।

শিক্ষার্থীরা ফিরে গেছেন শ্রেণিকক্ষে, কিন্তু এখনও চোখ রাখছেন ভবিষ্যতের দিকে—যেখানে তারা চায় একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং কাঠামোগতভাবে সুষ্ঠু শিক্ষা পরিবেশ। এই প্রত্যাবর্তন কেবলই ক্লাসে ফেরা নয়, এটি একটি বৃহত্তর প্রত্যয়—নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য লড়াইয়ের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত