প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনেও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির ব্যস্ততা অব্যাহত রয়েছে। ঈদের প্রথম দিনের চাপ কিছুটা কমে এলেও শুক্রবার সকাল থেকে নগরীর অলিগলি, আবাসিক এলাকা এবং নির্ধারিত কোরবানির স্থানে আবারও দেখা গেছে পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের ব্যস্ত দৃশ্য। পরিবার-পরিজনের অংশগ্রহণে কোথাও চলছে মাংস ভাগ-বাটোয়ারা, আবার কোথাও কসাইদের সহযোগিতায় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যারা ঈদের প্রথম দিনে কোরবানি দিতে পারেননি, তাঁদের বড় একটি অংশ দ্বিতীয় দিনে কোরবানি সম্পন্ন করছেন। কেউ কসাই সংকটের কারণে পিছিয়ে গেছেন, কেউ আবার অতিরিক্ত ভিড় এবং নির্ধারিত স্থানে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে আজকের দিনের জন্য কোরবানি রেখে দেন।
ইসলামী বিধান অনুযায়ী ঈদুল আজহার প্রথম দিন ছাড়াও দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন পর্যন্ত কোরবানি করার সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের পরবর্তী দিনগুলোতে রাজধানীজুড়ে কোরবানির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সকাল থেকেই রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা এবং বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় কোরবানির দৃশ্য চোখে পড়ে। অনেকেই পরিবার নিয়ে একসঙ্গে কোরবানি সম্পন্ন করছেন। কোথাও শিশুদের মধ্যে ঈদের আনন্দ, কোথাও আবার প্রবীণদের তত্ত্বাবধানে ধর্মীয় রীতি মেনে পশু জবাইয়ের আয়োজন দেখা গেছে।
অনেক বাসিন্দা জানান, প্রথম দিনের তুলনায় আজ পরিবেশ কিছুটা স্বস্তিদায়ক। কসাই পাওয়া সহজ হয়েছে এবং নির্ধারিত স্থানে অপেক্ষাও তুলনামূলক কম করতে হয়েছে। ফলে অনেকেই শান্তভাবে কোরবানি সম্পন্ন করতে পারছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির সঙ্গে যুক্ত কসাইদের ব্যস্ততাও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌসুমি কসাইরা ঢাকায় এসেছেন। ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের জন্য তাঁরা রাজধানীতে অবস্থান করছেন এবং পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের কাজে অংশ নিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার বড় ও মাঝারি আকৃতির একটি গরু প্রস্তুত করতে কসাইদের মজুরি নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে একটি ছাগল প্রস্তুতে গড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে পশুর আকার, কাজের পরিমাণ এবং এলাকাভেদে এই মজুরিতে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
কসাইদের কেউ কেউ জানান, প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনে কাজের চাপ কিছুটা কম থাকে। ফলে আজ তারা তুলনামূলক ধীরস্থিরভাবে কাজ করতে পারছেন। তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অনেক এলাকায় এখনও ব্যস্ততা বজায় রয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে রাজধানীতে আসা মৌসুমি কসাইদের জন্য এই সময়টি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। অনেকেই জানান, কোরবানির ঈদে কয়েক দিনের কাজ থেকেই তাঁরা বছরের উল্লেখযোগ্য আয় করতে সক্ষম হন। ফলে ঈদের এই মৌসুম তাঁদের জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও সক্রিয় দেখা গেছে। বিভিন্ন এলাকায় পশুর রক্ত, চামড়া ও অন্যান্য বর্জ্য দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। কোথাও কোথাও বিশেষ গাড়ি ব্যবহার করে বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নগরবাসীর অনেকে জানিয়েছেন, আগের বছরের তুলনায় এবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কারণে দুর্গন্ধ ও জনভোগান্তি তুলনামূলক কম হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তারা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশুর বর্জ্য দীর্ঘ সময় খোলা স্থানে পড়ে থাকলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই দ্রুত অপসারণ এবং জীবাণুনাশক ব্যবহার প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে বাজারে পশুর চামড়া সংগ্রহ নিয়েও চলছে ব্যস্ততা। বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চামড়া সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। কোরবানির দ্বিতীয় দিনেও অনেক পরিবার চামড়া সংরক্ষণ ও বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, কোরবানি শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি পারস্পরিক সহযোগিতা, ত্যাগ এবং সামাজিক সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ঈদের দ্বিতীয় দিনেও পরিবার ও প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণে সেই সামাজিক বন্ধনের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে।
এছাড়া অনেক এলাকায় দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে কোরবানির মাংস বিতরণ করতে দেখা গেছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে মাংস পাঠাচ্ছেন, আবার কেউ অসচ্ছল পরিবারের খোঁজ নিয়ে তাদের হাতে কোরবানির অংশ তুলে দিচ্ছেন। ফলে ঈদের আনন্দ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে রাজধানীতে ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনেও কোরবানির আমেজ পুরোপুরি বজায় রয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসন, পারিবারিক মিলন এবং সামাজিক সম্প্রীতির সমন্বয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা এখনও উৎসবমুখর পরিবেশে মুখরিত হয়ে আছে।