প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় কলেজছাত্রী ঝর্ণা রানী দেউড়ীকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি লিটন মন্ডলকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। প্রায় ১৭ বছর ধরে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলা এই মামলায় উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত মরদেহ শনাক্তকরণেও পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ২০১৯ সালে জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের আইনি পরিণতি বদলে যায়।
পলাতক আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী বুলবুল রাবেয়া বানু রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলার বিচারিক পর্যালোচনায় আদালত দেখতে পেয়েছেন যে অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু এ মামলায় সেই মানদণ্ড পূরণ হয়নি। ফলে আদালত আসামিকে খালাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আইনজীবী আরও জানান, মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ঝর্ণা রানী দেউড়ীর মরদেহ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে যথাযথভাবে শনাক্ত করা হয়নি। এ কারণে তদন্ত ও প্রমাণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি থেকে গেছে বলে আদালত মনে করেছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১৪ মে পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) এলাকার কলেজছাত্রী ঝর্ণা রানী দেউড়ী নিখোঁজ হন। তার পরিবার অভিযোগ করে, প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় লিটন মন্ডল তাকে অপহরণ করেন। নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর বরিশালের বানারীপাড়া এলাকায় একটি নদী থেকে এক তরুণীর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় অজ্ঞাতপরিচয়ে মরদেহটি দাফন করা হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর দেখে ঝর্ণার পরিবারের সদস্যরা ধারণা করেন যে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি তাদের মেয়ের। এরপর তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বিষয়টি সামনে আসে। একই বছরের ২৪ মে ঝর্ণার বাবা নেছারাবাদ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় লিটন মন্ডলসহ চার থেকে পাঁচজনকে অজ্ঞাত সহযোগী হিসেবে আসামি করা হয়।
তদন্ত শেষে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন হলে দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণ পর্যালোচনার পর ২০১৯ সালের ২৭ জুন জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল লিটন মন্ডলকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তবে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের রায় পুনর্বিবেচনা করে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে মামলার তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং আলামত উপস্থাপনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। আদালত মনে করেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে অভিযোগকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়। সামান্য সন্দেহের অবকাশ থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের দৃষ্টিতে সেই সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। এই নীতির আলোকে মামলার উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত খালাসের রায় দেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মামলায় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, বিশেষ করে ডিএনএ পরীক্ষার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। মরদেহ শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তদন্ত আরও শক্তিশালী হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা কমে আসে। একই সঙ্গে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তদন্তকারী সংস্থার দক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাইকোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে বহু বছর ধরে আলোচিত একটি হত্যা মামলার নতুন আইনি অধ্যায়ের সূচনা হলো। তবে রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ রায়ের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল বিভাগের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে মামলার চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি নির্ভর করবে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের ওপর।
এই রায় আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, ফৌজদারি মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী তদন্ত, নির্ভুল বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বিচার ব্যবস্থার মৌলিক নীতি অনুযায়ী, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দণ্ডিত করা যায় না—হাইকোর্টের এই রায় সেই নীতিকেই পুনর্ব্যক্ত করেছে।