প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিল্পের বিকাশ, আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দিতে যুগোপযোগী শুল্ক সুবিধা দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন ও সংযোজন খাতে কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ শুল্ক ছাড়ের ফলে স্থানীয় শিল্প যেমন আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য সুলতানা আহমেদের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি শিল্প অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পকে উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেছে। এর মাধ্যমে দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার ডেস্কটপ কম্পিউটার, ল্যাপটপ, অল-ইন-ওয়ান পিসি, নোটবুক, নোটপ্যাড, ট্যাবলেট, সার্ভার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, রাউটার, নেটওয়ার্ক ডিভাইস, মনিটর, ডিজিটাল ঘড়ি এবং মোবাইল প্রযুক্তিপণ্যসহ বিভিন্ন আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইস দেশে উৎপাদন ও সংযোজনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা কার্যকর করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উচ্চমূল্যের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারপ্রধান বলেন, আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এক শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। এর ফলে উৎপাদকরা তুলনামূলক কম ব্যয়ে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবেন এবং উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
তিনি আরও জানান, দেশে ডিজিটাল ডিভাইস সংযোজন বা অ্যাসেম্বলিং শিল্পকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও পাঁচ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস শুল্কসহ সম্পূরক শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি এবং মূল্য সংযোজন কর মওকুফের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই নীতিগত সহায়তা দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পকে আরও গতিশীল করবে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে শুধু আমদানি ব্যয় কমবে না, বরং দেশের রপ্তানি সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি প্রযুক্তিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়লে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলেও দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, এই শুল্ক সুবিধা শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নয়, সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে। উৎপাদন ব্যয় কমে যাওয়ায় দেশীয় বাজারে উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন ডিভাইস তুলনামূলক কম দামে পাওয়া সম্ভব হবে। ফলে শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার, গবেষক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও বেশি সুযোগ পাবে।
সরকারপ্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিপণ্যের সহজলভ্যতা ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিকাশ এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে।
অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনে কর ও শুল্ক সুবিধা স্থানীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী হতে পারে। এতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে উৎপাদন কেন্দ্র বৈচিত্র্যকরণের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আগামী কয়েক বছরে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের অন্যতম আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এজন্য শুল্ক সুবিধার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের এই উদ্যোগকে দেশের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে। পাশাপাশি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সুপরিচিত ও আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথও সুগম হবে।