সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন বেড়েছে ৭৪ শতাংশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ২১ বার
সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন বেড়েছে ৭৪ শতাংশ

প্রকাশ:  ১৫ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং অন্যান্য আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার হয়েছে। এরই প্রতিফলন হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক অর্থবছরে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা পড়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রতিবেদন এসেছে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে, যা আর্থিক খাতে নজরদারি ও ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থার আরও কার্যকর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএফআইইউ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে জমা পড়া মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর) এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন (এসএআর)। তুলনামূলকভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৫টি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৩ হাজার।

আরও বিস্তৃত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ৫ হাজার ২৮০টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা পড়েছিল, সেখানে চার বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল সন্দেহজনক লেনদেন বৃদ্ধির চিত্র নয়; বরং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ এবং আইন মেনে চলার প্রবণতা বৃদ্ধিরও প্রতিফলন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (২০১৫ সালে সংশোধিত) এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য রিপোর্টিং সংস্থার জন্য সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিএফআইইউকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক। কোনো অস্বাভাবিক, অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিলম্ব না করে তা রিপোর্ট করতে হয়।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রতিবেদনের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর তদারকি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার উন্নয়ন, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আগের তুলনায় সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত ও রিপোর্ট করা সম্ভব হচ্ছে।

একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া, অবৈধ বাজি, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রার অনিয়ম এবং ডিজিটাল হুন্ডির মতো নতুন ধরনের আর্থিক অপরাধও নজরদারির আওতায় এসেছে। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন পরিবর্তিত হওয়ায় বিএফআইইউ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ২৮ হাজার ৭৫৫টি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে দেশের ব্যাংকগুলো, যা আগের অর্থবছরের ১৫ হাজার ৯৯১টির তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৮০৯। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতের রিপোর্টিং সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট প্রতিবেদনের ৯১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংকিং খাত থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কাস্টমার ডিউ ডিলিজেন্স, লেনদেন বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার উন্নতির ইতিবাচক ফল।

অন্যদিকে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর রিপোর্টিংয়েও অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া সন্দেহজনক প্রতিবেদনের সংখ্যা ১২১টি থেকে বেড়ে ২৫০টিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে অর্থ প্রেরণকারী বা রেমিট্যান্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদন ৯০০টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৫টিতে উন্নীত হয়েছে। যদিও মোট প্রতিবেদনের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের অংশ এখনও সীমিত, তবে ধীরে ধীরে তাদের অংশগ্রহণও বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন বৃদ্ধি সব সময় নেতিবাচক বার্তা বহন করে না। বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ করে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের তুলনায় আরও বেশি সতর্ক এবং ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, অবৈধ অনলাইন লেনদেন এবং ডিজিটাল আর্থিক অপরাধের নতুন প্রবণতা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সন্দেহজনক লেনদেনের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা গেলে অর্থপাচার ও অবৈধ অর্থ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ আরও কার্যকর অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে। এতে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও আরও সুদৃঢ় হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত