৮৮ লাখের বেশি সিম বন্ধ, ব্যবহার কমছে মোবাইলে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৭ বার
৮৮ লাখের বেশি সিম বন্ধ, ব্যবহার কমছে মোবাইলে

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সংস্থাটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রাহকপ্রতি ১০টির বেশি সিমকার্ড বাতিল করা হয়েছে, যার ফলে সারাদেশে ৮৮ লাখেরও বেশি সিমকার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে আরও প্রায় এক লাখ সিম সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।

বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, দেশজুড়ে সাইবার অপরাধের বিস্তার, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড এবং অপরাধীদের একাধিক সিম ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছিল। এই প্রেক্ষাপটে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে গ্রাহকপ্রতি সিমকার্ড ব্যবহারের সংখ্যা সীমিত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় চলতি বছরের নভেম্বর থেকে গ্রাহকের নামে থাকা ১০টির বেশি সিমকার্ড পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা শুরু হয়।

বিটিআরসি মনে করছে, অতিরিক্ত সিম ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্র দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল নম্বরকে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। জালিয়াতি, প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অনিয়ম, সাইবার বুলিং ও অনলাইন অপরাধে একাধিক সিমের ব্যবহার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। ফলে সিম ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিটিআরসির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম মনিরুজ্জামান জানান, যাচাই-বাছাই শেষে প্রায় ৮৯ লাখ অতিরিক্ত সিম শনাক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৮ লাখের বেশি সিম ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। বাকি প্রায় এক লাখ সিম বিভিন্ন মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে, তবে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলেই সেগুলোও বন্ধ করা হবে। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সিম ব্যবহারে স্বচ্ছতা আনা এবং অপরাধের ঝুঁকি কমানো।

বিটিআরসি আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে প্রতিটি গ্রাহকের নামে সর্বোচ্চ পাঁচটি সিমকার্ড রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। তবে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ ও আন্দোলনের আশঙ্কার কারণে আপাতত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়নি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে পাঁচটি সিমের সীমা কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারে স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর চালু এবং অতিরিক্ত সিম বন্ধের কারণে গত ছয় মাসে প্রায় ১৮ লাখ মোবাইল গ্রাহক কমে গেছে। একই সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৬২ লাখ ৬০ হাজার।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশে চারটি মোবাইল অপারেটরের মোট গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১৯ কোটি ৪২ লাখ। এক বছর পর জুলাই মাসে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৮ কোটি ৮৭ লাখে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দেশে মোট মোবাইল গ্রাহকসংখ্যা নেমে এসেছে ১৮ কোটি ৭০ লাখে। এই হ্রাসের বড় কারণ হিসেবে অতিরিক্ত ও অব্যবহৃত সিম বন্ধ করাকে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে একাধিক সিমে ডেটা প্যাক ব্যবহার করতেন এমন অনেক গ্রাহক এখন সীমিত সংখ্যক সিমে চলে আসায় সামগ্রিক ব্যবহারকারী সংখ্যা কমে গেছে। তবে অন্যদিকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৪৬ লাখে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট সেবার চাহিদা বাড়ায় অনেক গ্রাহক মোবাইল ইন্টারনেটের বদলে ব্রডব্যান্ডে ঝুঁকছেন।

টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক সিম ব্যবহারের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে একটি অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি ব্যবসা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং নানা অনলাইন সেবার জন্য একাধিক সিম ব্যবহার করতেন, আবার অনেক সিম দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকত। এসব সিম অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি ছিল বেশি। বিটিআরসির বর্তমান উদ্যোগ সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমাবে বলে তারা মনে করছেন।

তবে গ্রাহকদের একটি অংশ এই সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় একাধিক সিম রাখা অযৌক্তিক এবং এটি অপরাধ দমনে সহায়ক হবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, হঠাৎ করে সিম বন্ধ হওয়ায় ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক যোগাযোগে কিছুটা ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে একাধিক নম্বর ব্যবহার করে আসছিলেন, তাদের জন্য নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়া সময়সাপেক্ষ হচ্ছে।

বিটিআরসি বলছে, গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে সিম বন্ধের আগে যথাযথ নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং নম্বর পরিবর্তনের সুযোগও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সিম নিবন্ধন ও মালিকানা যাচাই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, ৮৮ লাখের বেশি সিম বন্ধের এই সিদ্ধান্ত দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং নাগরিক সুরক্ষার দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছেই। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে যখন প্রতিটি গ্রাহকের জন্য সিম সংখ্যা আরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে, তখন এই খাতের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত