রাজনৈতিক অস্থিরতা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিএনপিকেই টার্গেট করে জনগণকে বিমুখ করা হচ্ছে: মাসুদ কামাল

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ৪০ বার
রাজনৈতিক অস্থিরতা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিএনপিকেই টার্গেট করে জনগণকে বিমুখ করা হচ্ছে: মাসুদ কামাল

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দেশের রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘিরে এক টেলিভিশন আলোচনায় সরব মন্তব্য রেখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল। সাম্প্রতিক সময়ে পুরান ঢাকায় যুবদল সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা এবং বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার বিষয়গুলো নিয়ে তিনি বলেন, “এই পুরো ঘটনাক্রমটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক কিছু নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত, সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়ার অংশ, যার মাধ্যমে শুধু বিএনপি নয়, দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে সাধারণ মানুষের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতৃষ্ণ করে তোলা হচ্ছে।”

মাসুদ কামাল বলেন, “আমি আগেও বলেছি, দেশের রাজনীতিতে এখন এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে জনগণের আস্থা হারানো হচ্ছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর। উদ্দেশ্য একটাই—সব রাজনৈতিক দলকে, বিশেষ করে বিএনপিকে অসমর্থ, অকার্যকর ও নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা। অথচ যারা এই অপরাধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন কোনো তৎপরতা নেই। এটাই তো প্রমাণ করে, এখানে সরকারের ভূমিকা নির্লিপ্ত নয়, বরং এর পেছনে সরকারের অজানা কোনো পরিকল্পনা লুকিয়ে থাকতে পারে।”

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আপনি বিএনপির ওপর দায় চাপাতে পারবেন তখন, যখন দেখবেন বিএনপি এই অপরাধীদের পক্ষ নিয়ে পুলিশি অভিযানে বাধা দিচ্ছে, থানা ঘেরাও করছে কিংবা বিচারকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব ক্ষেত্রে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্তদের বহিষ্কার করছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে। তবু সরকার দায় চাপাচ্ছে বিএনপির উপর, অথচ প্রশাসন বা পুলিশ যারা সরাসরি এই অপরাধ ঠেকাতে পারত, তারা কেন ব্যর্থ হচ্ছে—এই প্রশ্ন কেউ তুলছে না।”

তিনি অভিযোগ করেন, “প্রচলিত আইন আছে, কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ নেই। যে ব্যক্তি চাঁদাবাজি করছে বা খুন করছে, সে কোন দল করে সেটা মুখ্য নয়। অপরাধ করলে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আজ প্রশাসন রাজনৈতিক বিবেচনায় কাজ করছে। অপরাধী যদি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করা হয়। অপরদিকে, বিরোধী দল সংশ্লিষ্ট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।”

মাসুদ কামাল বলেন, “এই পুরো প্রক্রিয়া ইন্টেনশনালি পরিচালিত হচ্ছে, যার লক্ষ্য শুধু বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। এভাবে জনগণের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক নিরুৎসাহ তৈরি করা হচ্ছে, যেন তারা ভাবেন—সব দলই খারাপ, রাজনীতি মানেই দুর্নীতি, সহিংসতা, ক্ষমতার লড়াই।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা এখন এমন এক বাস্তবতায় বাস করছি, যেখানে নির্বাচনবিহীন ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠিত করার মতলব রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আজীবন কেউ ক্ষমতায় থাকবে, কেউ আবার বলছেন পাঁচ বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চলবে। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মানেই হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন, যেন নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায়। আজ যেভাবে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে, তা পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, “ধরুন, একটি চুলায় রাখা কড়াই প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে আছে। সেই কড়াই ঠান্ডা করতে যদি আপনি হাতের তালু থেকে কিছু ফোঁটা পানি ছিটিয়ে দেন, শব্দ হবে ঠিকই, কিন্তু কড়াই ঠান্ডা হবে না। বিএনপিও এখন বহিষ্কার আর প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যেটা করছে, সেটাও অনেকটা এমনই—শব্দ হচ্ছে, কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধ হচ্ছে না। কারণ গোড়া থেকেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।”

তিনি বলেন, “রাজনীতি, নির্বাচন, গণতন্ত্র—এই শব্দগুলো এখন সাধারণ মানুষের কাছে তিক্ত হয়ে উঠছে। সরকারের কর্মকৌশলই এমনভাবে সাজানো যে মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিক, যেন প্রশ্ন না তোলে, যেন ভোট না চায়, যেন জবাবদিহি দাবি না করে। অথচ নির্বাচন ছাড়া কোনো সমাজে জবাবদিহিতা থাকে না। আজ যারা ক্ষমতায় আছে, তারা কাকে জবাব দেবে? যদি পাঁচ বছর বা আজীবন ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা থাকে, তাহলে তারা কেন জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেবে?”

মাসুদ কামাল আরও বলেন, “রাজনীতি এখন আর আদর্শ বা জনগণের অধিকার রক্ষার মাধ্যম নয়, এটা হয়ে উঠেছে বিভ্রান্তি ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল। তবে জনগণকে বুঝতে হবে, এই কৌশল থেকে মুক্তির একমাত্র পথ গণতন্ত্র, আর গণতন্ত্রের প্রথম ধাপই হলো স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এটি না হলে রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান নয়, বরং তা আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠবে।”

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, “জনগণকে রাজনীতি বিমুখ নয়, বরং রাজনীতি সচেতন হতে হবে। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার করতে হবে, কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, এবং কে দায়ী। তাহলেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে। আর ততদিন পর্যন্ত, এই পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলার ভেতরে থেকে সাধারণ মানুষের হতাশা আর বিভ্রান্তি শুধু বাড়তেই থাকবে।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত