প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংকট ও অনিয়মের প্রেক্ষাপটে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি জানিয়েছেন, লোকসানে থাকা এই পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা আগামী দুই বছরের মধ্যে তাঁদের জমাকৃত অর্থ ফেরত পেতে পারেন। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, আর্থিক দুরবস্থার কারণে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসব ব্যাংক আমানতের ওপর কোনো মুনাফা দিতে পারবে না।
গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর এসব কথা বলেন। দেশের ব্যাংক খাত সংস্কার, অনিয়ম দমন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান পদক্ষেপ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। গভর্নরের বক্তব্যে একদিকে যেমন বাস্তবতার কঠিন চিত্র উঠে এসেছে, তেমনি ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি পরিকল্পিত আশার কথাও শোনা গেছে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণের চাপে মারাত্মক লোকসানে রয়েছে। এই অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে আমানতকারীদের মুনাফা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “লোকসানের কারণে চলতি অর্থবছরেও মুনাফা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আমরা আশা করছি, কাঠামোগত সংস্কার ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যে আমানতকারীরা তাঁদের মূল অর্থ ফেরত পাবেন।”
গভর্নরের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন মূলত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আমানতকারীদের মুনাফার চেয়ে মূলধন সুরক্ষা ও ফেরত দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে যারা এসব ব্যাংকে আমানত রেখে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ব্যাংকগুলোর অডিট নিয়ে গুরুতর তথ্যও তুলে ধরেন। তিনি জানান, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ অডিটের সঙ্গে জড়িতদের ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অনিয়মের পেছনে যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। গভর্নরের ভাষায়, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে শুধু আর্থিক পুনর্গঠন নয়, বরং অনিয়মকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, পাঁচ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট এখনো চলমান রয়েছে এবং এটি সম্পন্ন করতে আরও প্রায় তিন মাস সময় লাগবে। এই অডিট শেষ হলে কারা কীভাবে ব্যাংকের অর্থ লুটপাট করেছে, কোন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং কারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল—সবকিছু আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসবে। তখন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, কাগুজে ঋণ এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। দুর্বল অডিট ব্যবস্থার কারণে এসব অনিয়ম বছরের পর বছর ধামাচাপা পড়ে ছিল। ফলে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক চিত্র গোপন থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভর্নরের এই বক্তব্য একদিকে যেমন বাস্তবতা স্বীকারের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে ব্যাংক খাতে সংস্কারের একটি কঠোর অবস্থানও প্রকাশ করে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য দুই বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করা একটি বড় প্রতিশ্রুতি। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনি প্রক্রিয়ার যথাযথ প্রয়োগ।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত যদিও আমানতকারীদের জন্য হতাশাজনক, তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি বাস্তবসম্মত। কারণ লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোকে জোর করে মুনাফা দিতে বাধ্য করলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। বরং ধাপে ধাপে লোকসান কমিয়ে, খেলাপি ঋণ আদায় করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
অন্যদিকে আমানতকারীদের একাংশের মধ্যে এখনও উদ্বেগ রয়েছে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, অতীতেও নানা আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে খুব কম অগ্রগতি হয়েছে। তারা চান, বাংলাদেশ ব্যাংক যেন শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপ নেয় এবং সময়মতো অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করে।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আশ্বস্ত করে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি নজরদারি করছে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য একটাই—ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অবস্থান দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংক খাতে আস্থা সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর। তাই পাঁচ ব্যাংকের সংকট সমাধান শুধু সংশ্লিষ্ট আমানতকারীদের নয়, বরং পুরো অর্থনীতির স্বার্থের সঙ্গেই জড়িত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের আমানত ফেরত নিয়ে গভর্নরের বক্তব্য একদিকে সতর্ক বাস্তবতার কথা বলছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য একটি রূপরেখা তুলে ধরছে। আগামী দুই বছরে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা নির্ভর করবে ফরেনসিক অডিটের ফলাফল, আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। আমানতকারীদের চোখ এখন সেই দিকেই—আশ্বাস নয়, বাস্তব ফল দেখতে চান তারা।