তেলের দাম কমে এশিয়ায় শেয়ারবাজারে উত্থান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
তেলের দাম কমে এশিয়ায় শেয়ারবাজারে উত্থান

প্রকাশ: ২৫ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাত শিগগিরই সমঝোতার পথে এগোতে পারে—এমন আশাবাদ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়ায় তেলের দাম কমে এসেছে এবং শেয়ার সূচকগুলোতে ইতিবাচক ধারা ফিরে এসেছে।

বিশ্ববাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক আলোচনা এবং যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনায় যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার ইঙ্গিত বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় প্রভাব ফেলেছে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব Donald Trump সম্প্রতি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-এর সঙ্গেও তাঁর আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়, যেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

এই রাজনৈতিক আলোচনার প্রভাব সরাসরি পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। সোমবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক ৯০ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম কমে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ দশমিক ৯৯ ডলারে, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কম। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় পর এটি একটি উল্লেখযোগ্য মূল্য সংশোধন।

বিশ্ববাজারে এমন পতনের মূল কারণ হিসেবে বিনিয়োগকারীরা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা হ্রাসের সম্ভাবনাকে দেখছেন। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই পথ ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু নতুন করে আলোচনায় প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে স্বস্তি ফিরেছে।

এদিকে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬৫ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি খরচ কমার সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা বাড়িয়েছে।

এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও একই প্রবণতা দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও ভারতের শেয়ারবাজারেও সূচকগুলো ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম কমলে উৎপাদন খরচ কমে, যা শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। ফলে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়া স্বাভাবিক।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্কও করছেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। যুদ্ধবিরতি বা দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বরং আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা পারমাণবিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরান দাবি করছে যে তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অতিরঞ্জিত উদ্বেগ তৈরি করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, সাম্প্রতিক আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এর ফলে বাজারে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি স্থায়ী নাও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

অন্যদিকে জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাজারে যে সাময়িক স্বস্তি দেখা দিয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হতে সময় লাগবে। কারণ যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে শুধু রাজনৈতিক সমঝোতাই নয়, বরং অবকাঠামো পুনর্গঠন, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা এবং উৎপাদন পুনরুদ্ধারেও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।

এমএসটি ফিন্যান্সিয়ালের জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান সল ক্যাভোনিক মন্তব্য করেন, বর্তমানে বাজারে স্বস্তির একটি পরিবেশ তৈরি হলেও বৈশ্বিক তেলের বাজার ২০২৭ সাল পর্যন্ত চাপের মধ্যে থাকতে পারে। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরতে সময় লাগবে এবং যুদ্ধকালীন সময়ে যে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা পূরণ করাও সহজ হবে না।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য জ্বালানি তেলের দাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। কারণ এর ওপর নির্ভর করে উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি। তাই তেলের দামের এই ওঠানামা শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির সামগ্রিক গতিপথেও বড় প্রভাব ফেলে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষার কৌশল নিচ্ছেন। একদিকে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আশা, অন্যদিকে অনিশ্চিত রাজনৈতিক বাস্তবতা—এই দুইয়ের মাঝে বাজার এখন একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে রাজনৈতিক আলোচনা কোন দিকে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে তেলের দাম ও শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ গতি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য সমঝোতার খবর আন্তর্জাতিক বাজারে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তব রাজনৈতিক অগ্রগতির ওপর। বিনিয়োগকারীরা তাই এখন সতর্ক নজর রাখছেন বৈশ্বিক কূটনৈতিক পরিস্থিতির দিকে, যা আগামী দিনে জ্বালানি ও শেয়ারবাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত