সভা-সেমিনারে আমলাদের কোটি টাকার সম্মানী বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
সভা-সেমিনারে আমলাদের কোটি টাকার সম্মানী বিতর্ক

প্রকাশ: ২৫ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সরকারি কর্মকর্তারা। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রশাসনিক কাঠামোর মূল লক্ষ্যই হলো নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ ও ভার্চুয়াল কর্মশালার নামে বিপুল অঙ্কের সম্মানী গ্রহণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের অংশ হওয়া সত্ত্বেও এসব কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অনেক কর্মকর্তা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন, যা সরকারি ব্যয় ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে নিয়মিত অনলাইন সভা, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সম্মানী, ভাতা, আপ্যায়ন ব্যয় এবং অন্যান্য খাত থেকে বড় অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভার্চুয়াল সভা বা অনলাইন কর্মশালার ক্ষেত্রেও সম্মানী প্রদানের বিষয়টি জনমনে বিস্ময় তৈরি করেছে।

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের একটি অনলাইন কর্মশালাকে ঘিরে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দাপ্তরিক সময়ের মধ্যেই আয়োজিত ওই কর্মশালায় অংশ নিয়ে কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের সম্মানী গ্রহণ করেন। যদিও প্রশাসনের একটি অংশ বলছে, সরকারি বিধিমালার মধ্যেই এসব সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্যই এ অর্থ দেওয়া হয়।

বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন কমিটি, নিয়োগ বোর্ড, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য নির্ধারিত সম্মানীর বিধান রয়েছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, বিসিএস পরীক্ষার মৌখিক বোর্ডে অংশগ্রহণ কিংবা বড় অঙ্কের সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত প্রাক্কলন কমিটির সভায় উপস্থিত থাকার জন্য পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানী পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সমালোচকদের দাবি, এসব কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত দাপ্তরিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ফলে একই কাজের জন্য আবার আলাদা সম্মানী গ্রহণ নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে।

অর্থ বিভাগের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আট বছরে শুধু প্রশিক্ষণ খাতেই প্রায় ১৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এই বিপুল অর্থের বড় অংশই বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার এবং বিদেশ সফরকেন্দ্রিক ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ব্যয়ের প্রকৃত সুফল কতটা প্রশাসনে প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অনেক নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব আর্থিক সুবিধা ভোগ করলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তব কাজ করা কর্মচারীরা প্রায়ই বঞ্চিত থাকেন। তাদের মতে, প্রকৃত কাজের চাপ বহন করেন যারা, তারা আর্থিকভাবে তেমন কোনো প্রণোদনা পান না। ফলে প্রশাসনের ভেতরে বৈষম্যের অনুভূতিও তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া কর্মশালা বা কাগুজে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। করোনা মহামারির সময় দেশের বিভিন্ন সরকারি অফিস বন্ধ থাকার মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মশালার নামে বিল উত্তোলনের ঘটনা সামনে আসে। একটি আলোচিত ঘটনায় বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুয়া কর্মশালা ও আপ্যায়ন ব্যয় দেখিয়ে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে অডিট প্রতিবেদনে অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে, যা প্রশাসনের ভেতরে আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অলিখিত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে সভা-সেমিনার ও প্রশিক্ষণ অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আয়োজন করা হয়। এতে একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে প্রশাসনের মূল কাজেও গতি কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কর্মকর্তা এখন নিয়মিত অফিস কার্যক্রমের বাইরেও বিভিন্ন কমিটি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন শুধুমাত্র অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধার কারণে।

এদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ নেওয়ার পর বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা Tarique Rahman ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারি ব্যয় কমাতে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। নিজের প্রোটোকল ব্যয় সীমিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ ব্যয় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধনের এই অবস্থানের মধ্যেই কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহণের বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় সংকোচনের সময়ে প্রশাসনিক ব্যয়ের এ ধরনের চিত্র জনমনে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।

দুর্নীতি ও সুশাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা Transparency International Bangladesh বা টিআইবি বলছে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য তৈরি কিছু বিধান অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অপচয় আরও বাড়তে পারে। টিআইবি মনে করে, সভা-সেমিনার ও প্রশিক্ষণ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বাধীন নিরীক্ষা এবং কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ বলছেন, উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে প্রশাসনিক আনুষঙ্গিক ব্যয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় জনস্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।

অন্যদিকে প্রশাসনের একটি অংশ দাবি করছে, সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, আধুনিক প্রশাসন পরিচালনায় প্রযুক্তি, নীতি বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এসব আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। তবে তারাও স্বীকার করছেন, কোথাও কোথাও অপব্যবহার বা অতিরিক্ত ব্যয়ের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক ব্যয় নিয়ে নতুন করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আর্থিক জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি খাতে যেন কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত হয় এবং জনগণের টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রশাসন আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত