প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সরকারি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলাটির রায় ঘোষণার দিন ধার্য হয়েছে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি। গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকসহ মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে করা এই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিচারিক প্রক্রিয়ার এ পর্যায়কে মামলাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
আজ রোববার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪–এর বিচারক রবিউল আলম মামলাটির রায়ের দিন ঘোষণা করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এদিন আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ উভয়ের যুক্তিতর্ক শোনা হয় এবং সব পক্ষের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের জন্য নির্দিষ্ট দিন ধার্য করেন। মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার থাকা আসামি খুরশীদ আলমকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয় এবং তাঁর উপস্থিতিতেই যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। খুরশীদ আলমের আইনজীবী শাহিনুর ইসলাম আদালতে বলেন, নির্ধারিত দিনে যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হওয়ায় আদালত স্বাভাবিক নিয়মেই রায়ের তারিখ দিয়েছেন।
এই মামলাটি শুরু থেকেই দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা সরকারি প্লট বরাদ্দে ক্ষমতার অপব্যবহার ও গুরুতর অনিয়ম করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধা দিতে নীতিমালা উপেক্ষা করে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং দুর্নীতির স্পষ্ট উদাহরণ। দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এসব অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হয়েছে এবং সরকারি নিয়ম-কানুনকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান গত বছরের ১৩ জানুয়ারি এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার অভিযোগপত্রে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকসহ মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। পরে তদন্ত শেষে একই বছরের ১০ মার্চ মামলাটিতে আসামির সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়ায়। তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন এবং তাতে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে অনিয়মের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ ও জটিল। আদালতে মোট ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের জবানবন্দিতে প্লট বরাদ্দের নথিপত্র, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, সাক্ষ্যপ্রমাণে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নিয়মবহির্ভূত প্রক্রিয়ায় প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। অপরদিকে আসামিপক্ষ দাবি করে, অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে।
গত ৩১ জুলাই ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ মামলাটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর আদেশ দেন। অভিযোগ গঠনের সময় আদালত বলেন, প্রাথমিকভাবে মামলাটি বিচারযোগ্য এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এরপর একে একে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার রায় কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্যই নয়, বরং দেশের দুর্নীতি বিরোধী লড়াইয়ের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সরকারি প্রকল্পে প্লট বা জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, সে প্রশ্নের উত্তর এই রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি হলে তা সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মামলাটির দিকে গভীর নজর রাখছেন। গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাবেক ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার বিচার শুরু হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই মামলাটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাস জোরদার করবে।
অন্যদিকে মানবাধিকার ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচার আইনের আওতায় আনাই সঠিক পথ। তারা বলছেন, ব্যক্তির পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এমন মামলাগুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তি জরুরি। এই রায়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতা আসতে পারে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি দেশের অন্যতম বড় আবাসন প্রকল্প হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর চাপ কমাতে পরিকল্পিত এ প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও সব ক্ষেত্রে বিচারিক পর্যায়ে বিষয়গুলো গড়ায়নি। এ কারণে বর্তমান মামলাটি জনমনে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
আদালতের রায় ঘোষণার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জনসাধারণের কৌতূহল বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন আলোচনায় মামলার সম্ভাব্য রায় নিয়ে নানা মতামত উঠে আসছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা সবাইকে রায় ঘোষণার আগে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাচ্ছেন এবং বলছেন, আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সবশেষে বলা যায়, পূর্বাচল প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা এই মামলার রায় শুধু একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে দেশবাসী, যা হয়তো ভবিষ্যতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে তুলবে।