মন্দা পেরিয়ে চাকা ঘুরছে আবার, গতি ফিরছে মোটরসাইকেল বাজারে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৪ বার
মন্দা পেরিয়ে চাকা ঘুরছে আবার, গতি ফিরছে মোটরসাইকেল বাজারে

প্রকাশ: ১৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের মন্দা কাটিয়ে আবারও গতি ফিরেছে দেশের মোটরসাইকেল খাতে। ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার ধাক্কায় যে বাজার একসময় থমকে গিয়েছিল, সেই বাজারেই ২০২৫ সালের শেষে দেখা মিলেছে আশার আলো। বিক্রির পরিসংখ্যান বলছে, ধীরগতির ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ধারায় ফিরছে মোটরসাইকেল ব্যবসা। শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়েও বাড়ছে চাহিদা, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোটরসাইকেল বিক্রি ছিল চার লাখের কিছু কম। অথচ ২০২৫ সাল শেষে সব ব্র্যান্ড মিলিয়ে বিক্রি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৬৪ হাজারে। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এই খাতে দীর্ঘদিন পর স্বস্তি ফিরিয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ ও ২০২৩ সালে বিক্রি যে তলানিতে নেমে গিয়েছিল, তার তুলনায় এই ঘুরে দাঁড়ানোকে অনেকেই দেখছেন ‘পুনরুজ্জীবনের শুরু’ হিসেবে।

এই মন্দার সূচনা হয়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে। ২০২২ সাল থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে ডলারের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে এর প্রভাব পড়ে প্রায় সব পণ্যের ওপর। মোটরসাইকেল শিল্পও এর বাইরে ছিল না। কারণ, দেশে সংযোজন হলেও মোটরসাইকেলের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশই আমদানি করতে হয়। ফলে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ও সংযোজন ব্যয় বেড়ে যায় এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ে খুচরা দামে।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে মোটরসাইকেলের দাম এক দফায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা অনেকটাই পিছিয়ে পড়েন। প্রয়োজন থাকলেও নতুন মোটরসাইকেল কেনা থেকে বিরত থাকেন অনেকে। ফলে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০২১ সালে যেখানে দেশে প্রায় ৫ লাখ ৯৬ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল, সেখানে ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৯২ হাজারে। ২০২৪ সালেও বিক্রিতে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য গতি আসেনি।

তবে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। এক বছরের বেশি সময় ধরে ডলারের বিনিময়মূল্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। ১২২ টাকার আশপাশে ঘোরাঘুরি করা ডলারের দাম মোটরসাইকেল শিল্পে একটি বড় স্বস্তি এনে দেয়। দাম স্থিতিশীল থাকায় নতুন করে আর বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। এতে ক্রেতাদের আস্থা কিছুটা ফিরতে শুরু করে এবং বিক্রির চাকা ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে।

বাজারে নতুন মডেলের মোটরসাইকেল আসা এবং কিস্তি সুবিধা সম্প্রসারণও বিক্রি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ড গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সহজ শর্তে কিস্তি সুবিধা চালু করেছে। এতে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা না থাকলেও অনেকেই মোটরসাইকেল কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। শহরের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এই সুবিধার প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ হোন্ডা লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান মনে করেন, মোটরসাইকেল বিক্রি বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক একসঙ্গে কাজ করেছে। তাঁর ভাষায়, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি কমে আসা, ডলারের দামের স্থিতিশীলতা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করা—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেলের বাজারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে প্রবাসী আয়ের অর্থ ব্যয়ের একটি বড় অংশ যাচ্ছে মোটরসাইকেল কেনায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যও এই বক্তব্যকে সমর্থন করে। ২০২৫ সালের পুরো বছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের বেশি থেকে নেমে গত জুনে ৯ শতাংশের নিচে এসেছে। এতে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমেছে এবং টেকসই ভোগ্যপণ্যের দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে আশার আলো থাকলেও পুরো চিত্র এখনো পুরোপুরি উজ্জ্বল নয় বলে মনে করেন অনেক ব্যবসায়ী। এসিআই মোটরসের মহাব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মদ অপশন বলেন, ডলারের দামের ধাক্কা কাটিয়ে বিক্রি কিছুটা স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু এই খাতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে, তার তুলনায় বিক্রির গতি এখনো কম। তাঁর মতে, বাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে হলে আরও কিছু সময় এবং নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।

সরকার ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার দিক থেকে তাকালেও চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। ২০১৮ সালের মোটরসাইকেল নীতিমালায় ২০২৭ সালের মধ্যে বার্ষিক ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী ২০২৫ সালে অন্তত আট লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের কথা থাকলেও বাস্তবে এই লক্ষ্য থেকে খাতটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমান বিক্রির পরিসংখ্যান সেই ব্যবধানই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

সুজুকি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান র‌্যানকন মোটর বাইকসের নির্বাহী পরিচালক কাজী আশিক উর রহমান মনে করেন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দাম। তিনি জানান, দেশে মোটরসাইকেল সংযোজনের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন হয় মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, যেখানে ভারতে তা ৯৫ শতাংশের বেশি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা না বাড়ালে দাম কমানো কঠিন হবে। তাঁর মতে, ১০০ সিসির মোটরসাইকেলের দাম যদি এক লাখ টাকার আশপাশে নামিয়ে আনা যায়, তাহলে বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এ জন্য সরকারি প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তাকে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যেও বাজারের ওঠানামার চিত্র স্পষ্ট। ২০২১ সালে দেশে মোটরসাইকেল নিবন্ধন হয়েছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ছাড়িয়ে। কিন্তু ২০২৩ ও ২০২৪ সালে নিবন্ধন কমে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০২৫ সালে আবার নিবন্ধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি, যা বিক্রি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতাকেই ইঙ্গিত করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মোটরসাইকেল খাত এখন এক ধরনের রূপান্তরকাল পার করছে। মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দাম কমানো, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। আসন্ন ঈদুল ফিতর ও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী বছরগুলোতে দেশের মোটরসাইকেল বাজার আবারও পুরোনো গতি ফিরে পেতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত