গুম ও নির্যাতন মামলা: হাসিনা-সহ ১২ আসামির সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
শেখ হাসিনা গুম নির্যাতন মামলা

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন এক মামলা আজ সোমবার (১৯ জানুয়ারি) থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শুরু হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক ও বর্তমান ১২ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে সাক্ষ্যগ্রহণ হবে। মামলার প্রসিকিউশন আদালতে আনা পাঁচটি অভিযোগের মাধ্যমে জানিয়েছে, ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ২৬ জনকে গুম করা হয় এবং পরে তাদের জেলখানার বিশেষ সেলে আটক রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।

এই মামলার ১৩ জন আসামির মধ্যে তিনজন সেনা কর্মকর্তা ইতিমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন। বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজনই বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআই (ডিরেক্টরেট অব জেনারেল অব ইন্টেলিজেন্স)-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রসিকিউশন জানায়, এসময় তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ নাগরিকদের ওপর গুম ও নির্যাতন চালিয়েছেন। মামলায় প্রদত্ত তথ্যের মধ্যে রয়েছে গ্রেফতারকৃতদের মুখে বলপ্রয়োগ, দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, অমানবিক আচরণ, শারীরিক ক্ষতিসাধন এবং আদালতের অনুমোদন ছাড়া আটক রাখা।

মামলার প্রেক্ষিতে গ্রেফতার আসামিরা আদালতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে অব্যাহতির আবেদন করেছেন। তাদের আইনজীবীরা আদালতকে জানিয়েছিলেন, অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট মৌলিক তথ্য নেই এবং গ্রেফতারকৃতদের কর্মকাণ্ডের কোনো অপরাধমূলক প্রমাণ আদালতে দাখিল হয়নি। তবে প্রসিকিউশন তাদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে।

আদালত সূত্র জানায়, আজ থেকে শুরু হওয়া সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়ায় মামলার মূল প্রমাণাদি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতি, সরকারি নথি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করা হবে। আদালতের এই কার্যক্রম একটি গুরত্বপূর্ণ পর্যায়ের হিসেবে গণ্য হচ্ছে, কারণ এটি দেশের মানবাধিকার সংক্রান্ত বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিরূপণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন ট্রাইব্যুনালের চারপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া সাংবাদিক ও দর্শকরা সীমিত সংখ্যক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনালের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে।

বিচারের গুরুত্ব বোঝাতে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা গুম এবং নির্যাতনের অভিযোগে বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। তারা উল্লেখ করেন, এই প্রক্রিয়া দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শনের একটি পরীক্ষা হবে।

বিচার প্রক্রিয়ার দিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নজর রাখছে। বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যেই আবেদন জানিয়েছে, প্রক্রিয়াটি যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়। এ সংস্থা থেকে বলা হয়েছে, গুম ও নির্যাতনের বিষয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার আওতায় আসে এবং বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলায় সঠিকভাবে প্রমাণ উপস্থাপন এবং নিরপেক্ষভাবে সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলে, এটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করবে।

প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ জনগণের উপর ভয়, চাপ ও অমানবিক আচরণ চালিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশে ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আদালত আজ থেকে শুরু হওয়া সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে মামলার পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ সংগ্রহে মনোনিবেশ করবে।

এদিকে, রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ নাগরিকরা বিচার প্রক্রিয়ার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। তারা আশাবাদী, এটি দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি এটি রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির অপব্যবহার রোধে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত