বিশ্ববাজারে স্বর্ণ–রুপার দামে রেকর্ড, বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে ঝোঁক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
বিশ্ববাজারে স্বর্ণ–রুপার দামে রেকর্ড, বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে ঝোঁক

প্রকাশ:  ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা ও ভূ–রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দাম নতুন ইতিহাস গড়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা এই দুই মূল্যবান ধাতুর দাম ইতোমধ্যে পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়, যা বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণ ও রুপার প্রতি আগ্রহ যে আবারও চূড়ায় উঠেছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ১৯ জানুয়ারি স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম একদিনেই ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৬৩ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে এই দাম আরও এক ধাপ এগিয়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৬৮৯ দশমিক ৩৯ ডলার স্পর্শ করে। শুধু স্পট মার্কেট নয়, ফিউচার বাজারেও একই রকম ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারিতে ডেলিভারির মার্কিন স্বর্ণ ফিউচার ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৬৯ দশমিক ৯০ ডলারে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হঠাৎ উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ায় বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণ ও রুপার দিকে ঝুঁকছেন।

গত শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড কেনার অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক বৃদ্ধির একটি ধারা বাস্তবায়ন করা হবে। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ডেনমার্কের অধীনস্থ বিশাল আর্কটিক দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক জোরালো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা রোববার এক জরুরি বৈঠকে বসে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থাসহ একটি বিস্তৃত কৌশল নির্ধারণে ঐকমত্যে পৌঁছান, যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক আরোপের পথ থেকে বিরত রাখা যায়।

স্টোনএক্সের সিনিয়র বিশ্লেষক ম্যাট সিম্পসন মনে করছেন, ভূ–রাজনৈতিক উত্তেজনাই বর্তমানে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রধান চালিকাশক্তি। তাঁর মতে, ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি ন্যাটো ও ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্যেও চাপ সৃষ্টি করছে। এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মনে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্বর্ণের দামে।

এই শুল্ক হুমকি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত সম্পদগুলোর দিকে। স্বর্ণের পাশাপাশি জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঙ্কের চাহিদাও বেড়েছে। এর বিপরীতে মার্কিন স্টক ফিউচার ও ডলারের মান কমেছে, যা বাজারে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন লাভের চেয়ে মূলধন সুরক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ইতিহাস বলছে, সুদের হার কম থাকলে এবং ভূ–রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে স্বর্ণের মতো অ–ফলনশীল সম্পদ ভালো পারফরম্যান্স দেখায়। বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। এই প্রেক্ষাপটে শুধু স্বর্ণ নয়, রুপার দামেও দেখা গেছে শক্তিশালী উত্থান। স্পট রুপার দাম ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৯২ দশমিক ৯৩ ডলারে পৌঁছেছে। আগের সেশনে রুপা রেকর্ড সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ০৮ ডলার ছুঁয়েছিল, যা বাজারে রুপার শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

ওসিবিসির কৌশলবিদ ক্রিস্টোফার ওং মনে করেন, রুপার মধ্যমেয়াদি বাজারচিত্র এখনও ইতিবাচক। তাঁর মতে, রুপার চাহিদা শুধু নিরাপদ বিনিয়োগের কারণেই নয়, শিল্প খাতের স্থিতিশীল চাহিদার কারণেও সমর্থন পাচ্ছে। সৌরশক্তি, ইলেকট্রনিক্স ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের মতো খাতে রুপার ব্যবহার বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই ধাতুর দামকে শক্ত ভিত দিচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক দ্রুত উত্থান বিনিয়োগকারীদের কিছুটা সতর্ক থাকার বার্তাও দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

স্বর্ণ ও রুপার পারস্পরিক দামের অনুপাতও বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে এই অনুপাত সর্বোচ্চ ১০৫ থেকে নেমে সর্বনিম্ন ৫০–এ দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো, স্বর্ণের তুলনায় রুপার দাম তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী হয়েছে। এই পরিবর্তন অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য নতুন কৌশল নির্ধারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মূল্যবান ধাতুর বাজারে শুধু স্বর্ণ ও রুপাই নয়, অন্যান্য ধাতুর দামেও উত্থান দেখা গেছে। স্পট প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ২ হাজার ৩৪৮ দশমিক ৩২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্যালাডিয়ামের দামও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৮০৮ দশমিক ৪৬ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গাড়ি শিল্প ও সবুজ প্রযুক্তিতে ব্যবহারের কারণে এসব ধাতুর চাহিদাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

বিশ্ববাজারে এই উত্থানের প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় বাজারেও। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বর্ণের দাম বাড়লে গহনা শিল্প ও ভোক্তা পর্যায়ে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা তাই পরামর্শ দিচ্ছেন, আবেগের বশে নয়, বরং বাজার পরিস্থিতি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভূ–রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যযুদ্ধের শঙ্কা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার যুগে স্বর্ণ ও রুপা আবারও নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে প্রমাণ করছে। বিশ্ববাজারে নতুন এই রেকর্ড কেবল সংখ্যার গল্প নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির গভীর সংকেত বহন করছে। সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উত্থান কতটা স্থায়ী হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত